পবিত্র কোরআন
থেকে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা
(২য় খন্ড)

আল্লাহর শায়ের বা চি‎হ্ন কি?

অনেকেই মনে করেন যে আল্লাহর কোনো শায়ের বা চি‎হ্ন নেই, কিন্তু না, আল্লাহর শায়ের বা চি‎হ্ন আছে মর্মে পবিত্র কোরআনের সূরা হজ্বের ৩২ নং আয়াতে তা উল্লেখ আছে। এই আয়াতে বলা হয়েছে শায়ের আল্লাহ। শায়ের শব্দের অর্থ হচ্ছে এমন একটি চি‎হ্ন যা দেখে আপনজনকে চেনা যায়। আরবি অভিধান পৃ. ১৫৩০)। কাজেই শায়ের আল্লাহ মানে আল্লাহকে চেনার জন্য একটি চি‎হ্ন। আল্লাহর সেই শায়ের দেখে প্রত্যেক নবীই আল্লাহকে চিনেছে, যার মাধ্যমে প্রত্যেক নবীকে ওহীকালীন সময়ে আল্লাহর ওহীকে ইবলিস থেকে হেফাজত করে (সূরা-হিযর, আয়াত-৯ ও ১৭ )।
এখন আমাদের জানতে হবে আল্লাহর চেহারা সম্পর্কে। আল্লাহ বলেন, যদি তুমি আল্লাহকে ভালোবাস তবে তার ঠিকানা হচ্ছে রসূল (ইমরান, ৩১ আয়াত)। যদি কেউ রসূলের আনুগত্য করে, সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল। (নেসা, ৮০ আয়াত)। যদি কেউ রসুলের কাছে বায়াত গ্রহণ করল, সে তো আল্লাহর কাছেই বায়াত গ্রহণ করল (ফাতহ, ১০ আয়াত)। যদি কেউ রসূলের হাতে হাত রাখল, সে তো আল্লাহর হাতেই হাত রাখল (ফাতহ, ১০ আয়াত)। কারণ তাদের হাতের উপরই আল্লাহর হাত, (ফাতহ, ১০ আয়াত)। রসূলের হাত যদি আল্লাহর হাত হয়, তাহলে রসূলের পা, আল্লাহর পা। রসূলের সুরুত, আাল্লাহর সুরত। রসূলের সুরত আল্লাহর সুরত এই জন্য যে, রসূলের সুরত আসছে আদম সুরত থেকে আর আদম সুরত আসছে আল্লাহর প্রকৃতি ও সুন্দর আকৃতির অনুকরনে আদম তৈরির মাধ্যমে (রুম, ৩০ আয়াত) (তীন, ৪ আয়াত)। এখানে উল্লেখ্য যে যেহেতু আল্লার একটি চেহারা আছে (কাছাছ, ৮৮ আয়াত)। সেহেতু আল্লাহর সেই চেহারা সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দর। আর সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দর আকৃতি অনুকরণেই আদম তৈরি (তীন, ৪ আয়াত) (মমিন, ৬৪ আয়াত)। (বি. দ্র. এই বিষয়ে এই পুস্তকে আল্লাহর নিজ আকৃতিতে আদম তৈরির অধ্যায় বিস্তারিত দেখুন)।
অতএব, রসূলের চেহারা আল্লাহর চেহারা থেকে আগত। আর তাই রসূল চেহারাই আল্লাহর শায়ের কারণ ঐ চেহারা ইবলিস ধারণ করতে সক্ষম নয়। আবার রসূলের মধ্যেই আল্লাহর অবস্থান (ক্বাফ, ১৬ আয়াত)। বি. দ্র.ঃ এই পুস্তকের আল্লাহর অবস্থান সর্বত্রই অধ্যায় এবং একত্ববাদের দ্বীন অধ্যায় বিস্তারিত দেখুন)। এই যুক্তিতে বলা যায়, রসূল চেহারায় আল্লাহর চেহারা বিশ্বাস করাই মমিন হওয়ার শর্ত। আর এভাবে যারা রসূল চেহারা মধ্যে রসূলকে বিলীন করে দিয়ে এই চেহারায় আল্লাহকে বিশ্বাস করলেন তারাই মমিন। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন, যারা আল্লাহ ও রসূলে বিশ্বাস করে তারা মমিন (হুজরাত, ১৫আয়াত)। আর মমিনদের জন্য সালাত কায়েম করা ফরজ (ইব্রাহিম, ৩১ আয়াত)। যাদের রসূল নেই, অন্তরে রসূল চেহারা নেই, তারা মমিন নয়। আর যারা মমিন না হয়ে সালাত আদায় করতে যায় তারা সালাতে উদাসিন থাকে বিধায় তাদের জন্য কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা (মাউন, ৬ আয়াত)।

কিতাবিদের ও কাফেরদের আনুগত্য করো না প্রয়োজনে বাসগৃহে সালাতের স্থান নির্ধারণ করো

যারা মমিন নয় তাদের সাথে বন্ধুত্ব করা যাবে না, এই মর্মে আল্লাহ বলেন, মমিনগণ যেন মমিনগণ ব্যতীত কাফেরদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করে (ইমরান, ২৮ আয়াত)। কাফেরদেরেক দ্বীনের বিষয়ে অনুগত্য করো না। (ফুরকান, ৫২ আয়াত)। এবং কাফির ও মোনাফিকদের আনুগত্য করো না। (আহযাব, ১আয়াত)। এবং পাপিষ্ঠদের আনুগত্য করো না (দাহর, ২৪ আয়াত)।
যদি কেউ কাফিরদের আনুগত্য করে তাহলে তাদেরকে বিপরীত দিকে ফিরিয়ে দিবে (এমরান ১৪৯ আয়াত)। যারা বর্তমান রসূল বিশ্বাস না করে শুধু কিতাব নির্ভরশীল, তারা কিতাবি, আল্লাহ বলেন তোমরা কিতাবিদের দল বিশেষের আনুগত্য করো না, তারা তোমাকে কাফির বানিয়ে ছাড়বে (ইমরান, ১০০ আয়াত)। কারণ তারা তোমাদের ঈমানের অনুসরণ করে না, যারা রসূল চেহারায় আল্লাহ বিশ্বাস করে কিতাবিরা তাদেরকে শত্রু বলে গণ্য করে। আল্লাহ বলেন, হে মমিন তোমাদের শত্রুকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না (মুমতাহিনা, ১ আয়াত)। কিতাবিদের সঙ্গ ধারণ থেকে নিজেকে বিরত রাখার জন্য প্রয়োজন হলে নিজের বাসগৃহে সালাতের স্থান নির্ধারণ করে সেখানে সালাত কায়েম কর (ইউনুস, ৮৭ আয়াত)।

আত্মিক কাবা হচ্ছে রসূল কাবা

মমিনদের আত্মিক কাবাই হচ্ছে রসূল কাবা। আর রসূল কাবাই হচ্ছে মানুষ কাবা। যেহেতু কাবাঘর মক্কা শহরে অবস্থিত তাই মানুষ কাবা অর্থাৎ রসূল কাবাকে লালন শাইজী তার গানের ভিতরে মানুষ মক্কা বলে আখ্যায়িত করেছেন। আর রসূল চেহারাই হচ্ছে আত্মিক কাবা। আর এই আত্মিক কাবায় অর্থাৎ মানুষ মক্কা, অর্থাৎ রসূল কাবায় হজ পালনের নির্দেশ এসেছে, এই মর্মে আল্লাহ বলেন, দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ রসূলের কাছে হজ পালনে আসবে পদব্রজে। (হজ, ২৭ আয়াত)। রসূলের কাছে উপস্থিত হওয়া মমিনদের জন্য হজস্বরূপ। আবার যাদের সামর্থ্য আছে, তাদের জন্য বাহ্যিক কাবায় অর্থাৎ হেরেম শরিফে হজ পালনের নির্দেশ আসছে, (ইমরান, ৯৭ আয়াত)। তাহলে দেখা গেল রসূল কাবায় অর্থাৎ রসূল চেহারায় সেজদা দেওয়াই আত্মসমর্পণ করার প্রক্রিয়া।

পাঁচ ওয়াক্ত সালাত কায়েম করার কথা কোরআনে উল্লেখ নেই


দিনে বা রাতের যে কোনো সময় সালাত আদায় করা যাবে। এজন্য আল্লাহ বলেন, সালাতী কার্যক্রমটা সার্বক্ষণিক (মাআরিজ, ২৩ আয়াত)। দিনে-রাতে ২৪ ঘণ্টার ভিতরে প্রথম ১২ ঘণ্টা সময়সীমার মধ্যে সালাত কায়েম করাকে ফরজ করা হয়েছে, বাকী ১২ ঘণ্টা সময়সীমার মধ্যে সালাত আদায় করাকে তাজ্জত করা হয়েছে। এই উদ্দেশ্যে আল্লাহ বলেন, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সালাত আদায় করা মমিনদের উপর লিখিত করা হয়েছে (নিছা, ১০৩ আয়াত)। এই আয়াতে মাউকুতা শব্দ এসেছে। মাউকুতা শব্দের অর্থ নির্ধারিত সময়সীমা। (আরবি অভিধান পৃ. ২৩১৮)। এখানে নির্ধারিত সময়সীমা বলতে ১ম ১২ ঘণ্টাকে বুঝানো হয়েছে।
তবে এখন আমাদের জানতে হবে, ১ম বার ঘণ্টার শুরুটা কখন থেকে হবে। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, সূর্য হেলে পড়ার পর হতে রাতের ঘন অন্ধকার পর্যন্ত সালাত কায়েম কর (বনি ইসরাইল, ৭৮ আয়াত)। অর্থাৎ দুপুর ১২ টার পর হতে রাত ১২টা পর্যন্ত সময়সীমাটা সালাত কায়েমের জন্য নির্ধারিত সময়সীমা। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, তোমরা সালাত কায়েম কর দিনের শেষাংশে এবং রাত্রের প্রথমাংশে। (হুদ ১১৪ আয়াত)। এই আয়াতে তারাফাই শব্দ এসেছে। তারাফাই শব্দের অর্থ হচ্ছে শেষ সীমা (আরবি অভিধান পৃ. ১৬৬৯)। এই আয়াতে জুলুফাই শব্দ এসেছে, জুলুফাই শব্দ প্রথম অংশ (আরবি অভিধান পৃ. ১৪০৭)। এই সময়সীমার মধ্যে সালাত আদায় করাকে মধ্যবর্তী সালাত বলে। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, তোমরা মধ্যবর্তী সালাতকে রক্ষা কর (বাকারা, ২৩৮ আয়াত)। এই দীর্ঘ ১২ ঘণ্টা সময়সীমার মধ্যে একবার সালাতকে রক্ষা করা তেমন একটা কঠিন কাজ নয়, এইজন্য আল্লাহ বলেন, দ্বীনের বিষয়ে আল্লাহ কাহারো উপর কঠোরতা আরোপ করেনা, বা সাধ্যের অতিরিক্ত কারো উপরে চাপিয়ে দেয় না। (হজ্জ, ৭৮ আয়াত)। এখানে উল্লেখ্য যে, অনেকে বলেন ফজরের সালাতটা ফরজ কাজ। কিন্তু না, কারণ সূর্য হেলে পড়ার পর হতে রাতের ঘন অন্ধকার পর্যন্ত সালাত কায়েম কর। কিন্তু ফজরের সালাতটা এই সময়সীমার ভিতরে পড়েনা, বিধায় ফজরের সালাত ফরয হলে বনি ইসরাইলের ৭৮ আয়াতের পরিপন্থী হয়। কিন্তু যদি কোনো বুঝ কোনো আয়াতের পরিপন্থি হয় তাহলে সেই বুঝ পরিহার করা উচিত। তাই ফজরের সালাতটা কোনো অবস্থায়ই ফরয নয় এটা সালাতে তাজ্জত (বনি ইসরাইল, ৭৮ আয়াত)। কারণ ফজরের সময়টা যদি দিনের অংশের সাথে গণ্য করা হয় তাহলে এটা হয় দিনের প্রথমাংশ, দিনের প্রথমাংশের সালাত তাজ্জতের পর্যায়ভুক্ত (বনি ইসরাইল, ৭৮ আয়াত)। আবার যদি ফজরটা রাতের অংশের সাথে ধরি তাহলে ফজরটা রাতের শেষাংশে পড়ে, আর রাতের শেষাংশের সালাতটা হচ্ছে তাজ্জতের সালাত (বনি ইসরাইল, ৭৮ আয়াত)। প্রাচীন কাল থেকে মানুষ ফজরের সালাতকে তাজ্জতের সালাত হিসেবে আদায় করে আসছে, তাই আরবি ভাষার সময়ের তালিকায় ফজরের সালাতের সময় নামে একটি সময়ের উল্লেখ পাওয়া যায়, এই মর্মে আল্লাহ বলেন, তোমরা ফজরের সালাতের পূর্বে কাহারো ঘরে প্রবেশ করার পূর্বে অনুমতি প্রার্থনা করবে (নূর, ৫৮ আয়াত)। এই আয়াত দিয়ে অনেকেই ফজরের সালাতকে ফরজ প্রমাণ করে, কিন্তু না, এই আয়াতে ফজরের সালাত কায়েম কর নির্দেশ আসে নি। বিধায় ফজরের সালাতটা ফরজ নয় বরং এটা তাজ্জতের সালাত। তাছাড়া পবিত্র কোরআনে কোথাও ফজরের সালাত কায়েম কর মর্মে কোনো আয়াত আসে নি কিংবা সকাল সন্ধ্যায় সালাত কায়েম কর এই মর্মেও কোনো আয়াত আসে নি।
কাজেই সালাতের সময়সীমা বলতে দিনের শেষাংশ এবং রাতের ১ম অংশ, অর্থাৎ দুপুর ১২টার পর হতে রাত্র ১২ টা পর্যন্ত এই সময়সীমার মধ্যে কয়বার সালাত কায়েম করতে হবে মর্মে কোনো সংখ্যা উল্লেখ নেই বিধায়, এই সময়সীমার মধ্যে কমপক্ষে একবার সালাত কায়েম করা ফরয এটাই প্রমাণ হয়। অর্থাৎ রাত্র ১২টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত তাজ্জত সালাতের সময়। কাজেই পাঁচ ওয়াক্ত সালাত কায়েম করা মর্মে পবিত্র কোরআনে কোনো আয়াত আসে নি। তারপরও যদি কেউ পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে তাতে কোনো দোষ নেই। তবে দ্বীনের বিষয়ে আল্লাহ কাহারো উপর সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেয় না। (মমিন ৬২, আয়াত, এবং আরাফ ৪২ আয়াত)। আর দ্বীনকে সহজ করার জন্য আল্লাহ দ্বীনে পাঁচবার আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করতে বলেছেন। (সূরা ত্বাহা : ১৩০) এখানে উল্লেখ্য যে, এই আয়াত দিয়ে অনেকেই পাঁচ ওয়াক্ত সালাত প্রমাণ করে থাকেন। তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছি, সূরা ত্বহার ১৩০ নং আয়াতে সালাত শব্দ আসেনি। এই আয়াতে এসেছে সুবহানাল্লাহ ওয়া বিহামদিহি। আর এটা করতে তাহির হওয়া ফরয নয়। আর এর জন্য সেজদাও জরুরি নয়। অথচ সালাতের পূর্বে তাহির হওয়া ফরজ। (সূরা মায়েদা : ৬) এবং সালাতে সেজদা ফরজ। (সূরা নেসা : ১০২)
আল্লাহ বলেন, তোমরা মানুষকে প্রভুর পথে আহ্বান কর হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা। এবং তাদের সহিত তর্ক কর উত্তম পন্থায়। (নহল, ১২৫ আয়াত)। আর হিকমতের এই শিক্ষাই হচ্ছে রসূলের কাছে (বাকারা ১৫১ আয়াত)। কাজেই রসূল চেহারায় সেজদা কায়েম করাই হচ্ছে সালাত কায়েম করা।

রসূলের আনুগত্য করা ফরয

আল্লাহ বলেন, তোমরা রসূলের আনুগত্য কর, (নূর ৫৪ আয়াত)। যেহেতু রসূলের আনুগত্য করা আল্লাহর হুকুম, সেহেতু, রসূলের আনুগত্য করা এটা সকলের জন্য ফরয। আর এই ফরয কাজটা আমরা কিভাবে করতে পারি সেটা আমাদের জানা দরকার। অনেকের ধারণা নবী (সা.) যা কিছু করেছে তা করলেই রসূলের আনুগত্য হয়ে যায়। কিন্তু না, নবী (স.) যা কিছু করেছে, সেগুলি পালন করলে নবীর সুন্নত পালন করা হবে। কিন্তু এগুলো করলে রসূলের আনুগত্য করা ফরজ এই কাজটা আদায় হবে না, কারণ সকল সুন্নত একসাথে করলেও একটি ফরজ থেকে রেহাই পাওয়ার উপায় নেই। অনেকেই বলেন, নবী (স.) যে সকল ফরজ কাজ আমাদের জন্য রেখে গেছেন, যেমন- ছালাত, যাকাত এই গুলি পালন করলেই রসুলের আনুগত্য করা ফরজ কাজটা আদায় হবে। কিন্তু না, এই মর্মে আল্লাহ বলেন, তোমরা ছালাত কায়েম কর এবং যাকাত আদায় কর ও রসূলের আনুগত্য কর। (নূর, ৫৬ আয়াত)। এই আয়াতে প্রমাণ হয় ছালাত যাকাত আদায় করার পরও রসূলের আনুগত্য করতে হবে। অনেকেই শুধু ছালাত যাকাত আদায় করার মাধ্যমেই আল্লাহর আনুগত্য করতে চায়। কিন্তু না, ছালাত যাকাত আদায় করার পরও আল্লাহর আনুগত্য করতে হবে। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, তোমরা ছালাত কায়েম কর এবং যাকাত আদায় কর এবং আল্লাহর আনুগত্য কর ও রসূলের আনুগত্য কর (আহযাব, ৩৩ আয়াত) এবং (মুজাদালা, ১৩ আয়াত)। ছালাত, যাকাত আদায় করার পরও এই আয়াতে আল্লাহর আনুগত্য আলাদা ভাবে করতে বলা হয়েছে। আর আল্লাহর আনুগত্য করার একমাত্র পথই হচ্ছে রসূলের আনুগত্য করা। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে রসূলের অনুসরণ কর (ইমরান, ৩১ আয়াত)। অতএব, যারা রসূলের আনুগত্য করল, তারাই আল্লাহরই আনুগত্য করল (নেছা, ৮০আয়াত)। যাদের রসূল নেই, রসূলের আনুগত্য নেই, তারা আল্লাহর আনুগত্য করতে পারবে না। কাজেই আল্লাহর আনুগত্য করতে হলেই রসূলের আনুগত্য করা প্রয়োজন। রসূল বাদে আল্লাহর আনুগত্য করার উপায় নেই। অনেকেই বলে, আমরা নবীর সুন্নত ঠিকমত পালন করলেই নবীকে পাব, কিন্তু না, এই মর্মে আল্লাহ বলেন, যারা আল্লাহ ও রসূলের আনুগত্য করবে, তারাই নবীর সঙ্গী হবে। (নেছা, ৬৯ আয়াত)। কাজেই রসূলের আনুগত্য করা ছাড়া নবী (স.) কে পাওয়া যাবে না। অনেকেই বলে আমরা যদি নবী (সা.) এর সুন্নতগুলো যদি ঠিকমত আদায় করি সালাত, যাকাত ও বিভিন্ন এবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে জান্নাতে যেতে পারি তাহলে রসূলের আনুগত্য করার দরকার কি? তাদের জন্য বলতে হচ্ছে, রসূলের আনুগত্য না করে জান্নাতে যাবার কোনো উপায় নেই। এই মর্মে আল্লাহ বলেন "যারা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করবে তারাই জান্নাতে যাবে (ফাতহ্ ১৭ আয়াত)। কাজেই আল্লাহর আনুগত্য ও রসূলের আনুগত্য করা ছাড়া জান্নাতে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। অনেকেই বলে বিভিন্ন ভাবে নেকী সংগ্রহ করে, যদি আমরা হাশরের দিন, আমলনামা ডান হাতে পাই, তবেতো আর কোনো চিন্তা নেই। তাদের জন্য বলছি, যাদের আল্লাহর আনুগত্য ও রাসূলের আনুগত্য নেই তাদের কর্মফল যেকোনো ভাবে বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে। যারা আল্লাহর আনুগত্য ও রাসূলের আনুগত্য করবে তাদের কর্মফল বিনষ্ট হবে না (হুজরাত ১৪ আয়াত) (মোহাম্মদ ৩৩ আয়াত)। কাজেই আল্লাহর আনুগত্য ও রাসূলের আনুগত্য না করলে যে কোনো কারণে কর্মফল বিনষ্ট হতে পারে বিধায় তারা সে দিন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ আল্লাহর আনুগত্য ও রাসূলের আনুগত্য করা ঈমানের পরিচয়, যাদের আল্লাহর ও রাসূলের আনুগত্য নেই তাদের ইমান নেই। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, ইমান ব্যতীত সকল মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে (আসর, ১আয়াত)। যারা আল্লাহর ও রসূলের আনুগত্য করবে, তারাই সফলকাম হবে (নূর, ৫২আয়াত)। এবং যারা আল্লাহর ও রসূলের আনুগত্য করবে, তারা অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে (আহযাব, ৭১ আয়াত)। কাজেই যারা আল্লাহর আনুগত্য ও রসূলের আনুগত্য না করে তারা সাফল্য অর্জন করতে পারবে না। এই পর্যায়ে এসে রসূলকে না মেনে তার আনুগত্য না করে তারা এমনটি বলে যে, বিভিন্ন এবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে যদি আমরা আল্লাহ পাকের দয়া বা অনুগ্রহ লাভ করতে পারি, তাহলেই আমরা পরিত্রাণ পাব। তাদের জন্য বলতে হচ্ছে আল্লাহর আনুগত্য ও রসূলের আনুগত্য বাদে আল্লাহর দয়া ও ক্ষমা পাওয়ার কোনো উপায় নেই। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য ও রসূলের আনুগত্য কর যাতে তোমরা কৃপা লাভ করতে পার (ইমরান, ১৩২ আয়াত)। আল্লাহ বলেন, তোমরা রসূলের অনুসরণ কর, যাতে তোমরা ক্ষমা পেতে পার। (ইমরান, ৩১ আয়াত)। কাজেই আল্লাহর আনুগত্য ও রসূলের আনুগত্য ও অনুসরণ ব্যতীত আল্লাহর দয়া ও ক্ষমা পাওয়ার কোনো উপায় নেই। আল্লাহ বলেন, আল্লাহর দয়া ছাড়া কেউ সেদিন শাস্তি থেকে রেহাই পাবে না। (নুর, ১৪ আয়াত)।
উপরিউক্ত আলোচনায় আমরা এই মর্মে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে যাদের রসূল নেই, অর্থাৎ যাদের কাছে রসূল অনুপস্থিত আর অনুপস্থিত ব্যক্তির অনুসরণ ও আনুগত্য করা সম্ভব নয় বিধায় তারা রসূলের অনুসরণ ও আনুগত্য করতে ব্যর্থ। বিধায় যাদের রসূলের আনুগত্য নেই, আর রসূলের আনুগত্য নেই বিধায় তাদের আল্লাহর আনুগত্য নেই। আর আল্লাহর আনুগত্য ও রসূলের আনুগত্য নেই বিধায় তারা নবী (স.) এর সঙ্গী হতে পারবে না এবং জান্নাতে যেতে পারবে না, এদের কর্মফল বিনষ্ট হবে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তারা সফলকাম হতে পারবে না, তারা আল্লাহর কৃপা লাভ করতে পারবে না এবং আল্লাহর ক্ষমা লাভ করতে পারবে না। কাজেই রসূলের আনুগত্য করা ফরজ, অর্থাৎ রসুলের আনুগত্য ছাড়া সকল ইবাদত বন্দেগী করার পরও ইবলিসের অনুরসণ করার সামিল হয়, বিধায় আমাদের অবশ্যই রসূল দরকার।

রসূল ব্যবস্থা সার্বক্ষণিক

আল্লাহ বলেন, আমি প্রত্যেক জনপদের কেন্দ্রে আমার আয়াত আবৃতি করার জন্য রসূল প্রেরণ না করে কোনো জনপদ ধ্বংস করি না। (কাছাস, ৫৯ আয়াত)। আল্লাহ প্রত্যেক উম্মতের কাছে রসূল পাঠিয়ে থাকেন (ইউনুস, ৪৭ আয়াত)। এই ভাবে প্রত্যেকের কাছে রসূল না পাঠিয়ে আল্লাহ কাউকে শাস্তি দেন না। (বনি ইসরাইল, ১৫ আয়াত) রসূল না পাঠিয়ে কোনো জনপদ আল্লাহ ধ্বংস করলে বা আল্লাহ কাউকে শাস্তি দিলে তারা বলত, আমাদের কাছে রসূল প্রেরণ করলে না কেন? করলে আমরা মুমিন হতাম। (কাছাস, ৪৭ আয়াত)। মমিনদের মধ্য থেকেই মমিনদের কাছে রসূল পাঠায়। যারা মমিনদেরকে পবিত্র করে। (ইমরান, ১৬৪ আয়াত)। যারা রসূলগণকে অস্বীকার করেছিল তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে, তোমরা কি ভাবে কাফের হলে? তোমাদের মধ্যে রসূল থাকা সত্ত্বেও (ইমরান, ১০১ আয়াত)। সেদিন কাফেরদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে, তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের কাছে কি রসূল এসেছিল না? তারা বলিবে হ্যাঁ, এসেছিল, আমরা রসূলকে মানি নি (জুমার, ৭১ আয়াত)। এই মর্মে সাক্ষ্য দেয়া হবে যে, তাদের মধ্য থেকে তাদের কাছে রসূল এসেছিল, কিন্তু তারা রসূলকে অস্বীকার করেছিল (নহল, ১১৩ আয়াত)। তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের কাছে রসূল পাঠাই, যিনি তোমাকে কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেন, অজানা বিষয় শিক্ষা দেন (বাকারা, ১৫১ আয়াত)। এখানে উল্লেখ্য যে, তোমাদের মধ্য থেকে বলতে তোমাদের মধ্যে বর্তমান উপস্থিত রসূলকে বুঝানো হয়েছে। এই জন্য বলা হয়েছে তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের কাছে রসূল পাঠানো হয়েছে। নিজেদের মধ্য থেকে বসূল বলতে নিজেদের বংশগত অবস্থা বুঝানো হয় নি, কারণ জিন সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে এ যাবৎ পর্যন্ত কোনো রসূল আসে নি, তারপরও জিনদেরকে সেদিন জিজ্ঞাসা করা হবে তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের কাছে কি রসূল এসেছিল না? (আনামের ১৩০ আয়াত) এতে প্রমাণ হয় যে, তোমাদের মধ্য থেকেই রসূল পাঠিয়েছি কথা দিয়ে বংশগত বুঝানো হয় নি, বরং স্বয়ং রসূল উপস্থিত থাকার কথা বলা হয়েছে। রসূলের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য এই মর্মে সকল নবীর কাছ থেকে আল্লাহ অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে, তোমাদিগকে কিতাব ও হিকমত যা কিছু দিয়াছি অতঃপর তোমাদের কাছে যা কিছু আছে তার সমর্থক রূপে যখন রসূল তোমাদের কাছে আসবে তখন তোমরা অবশ্যই তাকে বিশ্বাস করবে এবং (রিসালাত দিয়ে) তাকে সাহায্য করবে। এই সম্পর্কে আমার অঙ্গিকার তোমরা কী গ্রহণ করলে? তারা বলিল আমরা স্বীকার করলাম। (ইমরান, ৮১ আয়াত)। তাই প্রত্যেক নবী তার শেষাংশে একজনকে রিসালাতের ভার অর্পণ করার মাধ্যমে রসূল পদে একজন রসূল রেখে গেছেন যাতে পরবর্তী নবী আসা পর্যন্ত রসূলের ধারা অব্যাহত থাকে। যেমনÑ মূসা (আ.)-এর পরবর্তীতে হারুনকে স্থলাভিষিক্ত করল (আরাফ, ১৪২ আয়াত)। তার পরবর্তীতে ধারাবাহিকভাবে পর্যায়ক্রমে রসূল এসেছে (বাকারা, ৮৭ আয়াত)। এভাবে ধারাবাহিকভাবে একের পর এক রসূল পাঠিয়ে রসূলের ধারা অব্যাহত রাখা হয়েছে (মমিন, ৪৪আয়াত)। এইভাবে নবীর শেষাংশে রিসালাতের ভার অর্পনের মাধ্যমে পরবর্তী নবী আসা পর্যন্ত রিসালাত প্রাপ্ত রসূলগণ দায়িত্ব পালন করেন। এই মর্মে আল্লাহ বলেন "নবী প্রেরণের বিরতির পর অর্থাৎ দুই নবীর মধ্যবর্তী ফাতারাতি পিরিয়ডে আমি রসূল পাঠাই, যাতে তারা না বলতে পারে, আমরাতো কোনো সতর্ককারী রসূল পাইনি। (মায়েদা, ১৯ আয়াত)। এই আয়াতে ফাতারাতি শব্দ এসেছে, ফাতারাতি অর্থ দুই নবীর মধ্যবর্তী সময়কাল (আরবি অভিধান, পৃ. ১৮৬২)। যেমন নবী ঈসা (আ.) এবং নবী মোহাম্মদ (স.) এর মাঝখানে ৫০০ বছর এই পিরিয়ডটা ফাতারাতি পিরিয়ড, যেখানে কোনো নবী ছিল না। এই পিরিয়ডে রিসালাতপ্রাপ্ত রসূলগণই দ্বীন প্রচার করছে। পূর্ববর্তী নবীর কিতাব অনুসারে দ্বীন প্রচার করাই একমাত্র রিসালাত প্রাপ্ত রসূলের দায়িত্ব (মায়েদা, ৯৯ আয়াত)। এইভাবে ফাতারাতি পিরিয়ডে নবী অনুপস্থিত থাকে আর অনুপস্থিত ব্যক্তির আনুগত্য করা সম্ভব নয় বিধায় পবিত্র কোরআনে নবীর আনুগত্য কর মর্মে কোনো আয়াত আসে নি। নবী সার্বক্ষণিক নয় বরং রসূল সার্বক্ষণিক উপস্থিত থাকে বিধায় কোরআনে বার বার রসূলের আনুগত্য কর কথা বলা হয়েছে। ফাতারাতি পিরিয়ডের রসূলগণ কিন্তু নবী নয় এরা শুধু রসূল।

এখানে উল্লেখ্য যে নবী একসময় শেষ হবে (৩৩:৪০)। তাই আল্লাহ বলেন রসূল না পাঠিয়ে কাউকে শাস্তি দেই না (১৭:১৫)। আরও অন্যান্য আয়াত যেমন- (২৮:৪৭), (২৮:৪৯), (৩:১০১), (২:১৫১), (৩:১৬৪), (২:৮৭) এবং (২৩:৪৪), (৪:১৫০) আয়াতগুলিতে নবী শব্দ আসে নাই। যদি উপরোক্ত আয়াতগুলিতে নবী শব্দ আসতো সেক্ষেত্রে নবী যখন শেষ হবে তার পরবর্তী সময়ের কাউকে শাস্তির আওতাভুক্ত করা যেতো না। এই জন্য উপরোক্ত আয়াতগুলিতে নবী শব্দ আসে নাই। পক্ষান্তরে উপরোক্ত আয়াতগুলিতে রসূল শব্দ এসেছে। এতে প্রমাণ হয় যে রসূল শেষ নহে বরং রসূল ব্যবস্থা ধারাবাহিকভাবে চালু আছে এবং থাকবে। আর তাই বর্তমানে সম্যক গুরুগণই সেই রসূল।

প্রত্যেক নবীই রসুল কিন্তু প্রত্যেক রসুল নবী নহে এবং নবী ও রসূলের মধ্যে পার্থক্য

প্রত্যেক নবী সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে মিশাক প্রাপ্ত, মিশাক শব্দের অর্থ অঙ্গিকার করা (ইমরান, ৮১আয়াত) কিন্তু প্রত্যেক রসূল মিশাকপ্রাপ্ত নয়। প্রত্যেক নবীই কিতাব প্রাপ্ত (ইমরান, ৮১আয়াত)। কিন্ত রসূল কিতাবপ্রাপ্ত নয়। প্রত্যেক নবীর প্রতি উছাল্লি আদায় করা মমিনগণের প্রতি নির্দেশ করা হয়েছে। (আহযাব, ৫৬আয়াত)। কিন্তু প্রত্যেক রসূলের প্রতি উছাল্লি আদায় করার কথা বলা হয় নি। নবীগণের সাহায্য ও বিশ্বস্ত সমর্থন ছাড়া রসূলের ধারার প্রবর্তন সম্ভব নয় ইমরান, ৮১আয়াতে এমনটি ইঙ্গিত আছে। কাজেই দেখা যায় উপরিউক্ত ৪টি কারণে নবী পদের পর্যাদা রসূল পদ অপেক্ষা বেশী।
নবীগণ হচ্ছেন নবী এবং রসূল। অর্থাৎ প্রত্যেক নবীই রসূল কিন্তু প্রত্যেক রসূল নবী নন। নবী হচ্ছে এক প্রকার। অর্থাৎ নবীদের ভিতরে কোনো পার্থক্য বা প্রকারভেদ নেই। (বাকারা, ১৩৬ আয়াত)। পক্ষান্তরে রসূলদের মধ্যে মর্যাদাগত পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় কারো উপর কারো শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। অর্থাৎ (নবুয়তপ্রাপ্ত ও রিসালতপ্রাপ্ত) রসূলগণের সাথে আল্লাহ (অহীর মাধ্যমে) কথা বলেছেন (বাকারা, ২৫৩ আয়াত)। অনেক রসূল প্রেরণ করেছে যাদের কথা পূর্বে আমি বলেছি এবং অনেক রসূলের কথা বলি নি (নেছা, ১৬৪ আয়াত)। অর্থাৎ দুই নবীর মধ্যবর্তী পিরিয়ডের রসূলদের নাম কিতাবে আসে নি। এতে প্রমাণ হয় রসূলের ভিতরে মর্যাদাগত পার্থক্য আছে। তবে বিশ্বাসগত প্রয়োগের ক্ষেত্রে রসূলগণের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, কারণ সকল রসূলের হাতের উপরই আল্লাহর হাত, এটা বিশ্বাস করতে হবে, দুই নবীর মধ্যবর্তী ফাতারাতি সময়কালে রসূলগণের উপর কোনো নবুয়ত পদ ছিলনা বিধায় তাদের উপর কোনো অহি নাযিল হয় নি বিধায় এরা নবী নয়। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, হে মোহাম্মদ তোমার পূর্বে কি এমন রসূল আমি পাঠাইনি? যারা নবী নয়? (হজ, ৫২ আয়াত)। অর্থাৎ যেসকল রসূলের উপরে নবুয়ত পদ নেই বিধায় তাদের উপর অহী আসে নি অর্থাৎ এরা ছিল অহী ব্যতীত রসূল, উপরিউক্ত আয়াতে তাদের কথা বলা হয়েছে। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, হে মোহাম্মদ, তোমার পূর্বে কি আমি এমন রসূল পাঠাইনি যারা ছিল অহী ব্যতীত? (আম্বিয়া, ২৫ আয়াত)। এই আয়াতে মা' শব্দ এসেছে, 'মা' শব্দের অর্থ না সূচক প্রশ্নবোধক (অভিধান পৃ. ২১৯৩) যাদের উপরে অহী নাযিল হয়নি, তারা ছিল দুই নবীর মধ্যবর্তী ফাতারাতি পিরিয়ডের রসূল, যারা ছিল শুধু রিসালাত প্রাপ্ত রসূূূল। এভাবে রিসালাতের ভার অর্পণ যার উপর করা হয় তিনি রসূল। এভাবে রসূলের ধারাবাহিকতা অক্ষুণœ রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে, রসূল হচ্ছে দুই প্রকার। একটি নবুয়তপ্রাপ্ত বা ওহীপ্রাপ্ত রসূল। অপরটি হচ্ছে নবুয়ত ব্যতীত বা ওহী ব্যতীত রসূল। এই আয়াতে প্রমাণিত হয় যে, প্রত্যেক রসূলই নবী নহে। এখানে উল্লেখ যে, 'তোমার পূর্বে আমি এমন অনেক নবী পাঠিয়েছি যারা রসূল নহে' এই মর্মে কোন আয়াত পবিত্র কোরানে নেই। যদি এমন আয়াত থাকত তাহলে বলা যেত যে, প্রত্যেক নবী রসূল নহে। কিন্তু না যেহেতু এইমর্মে কোন আয়াত নেই বিধায় প্রত্যেক নবী রসূল নহে এই কথার কোন ভিত্তি নেই বরং প্রত্যেক নবীই রসূল এটা নিশ্চিত। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, "মা-আরছালনা মিন কাবলিকা মিনাররাসূলি ওয়া-লা-নাবীই" (সূরা হজ্ব : ৫২) এই আয়াতে মা' শব্দ এসেছে, 'মা' শব্দের অর্থ না সূচক অথবা প্রশ্নবোধক (অভিধান পৃ. ২১৯৩) আরছালনা- অর্থ আমি পাঠাইয়াছি (আঃ অভিঃ পৃঃ ১৫২), কাবলিকা অর্থ তোমার পূর্বে (আঃ অভিঃ পৃঃ ১৯১৮) মিনাররাসূলিÑঅর্থ রসূলদের থেকে লা- অর্থ নাবাচক শব্দ। (আঃ অভিঃ পৃঃ ২১১৯)। আয়াতের অর্থটি হবে "আমি কি তোমার পূর্বে এমন রাসূল পাঠাইনি যারা নবী নহে?" এই আয়াত অনুসারে জানা গেল পূর্বে অনেক রসূল এসেছে যারা নবী ছিল না, শুধু রসূল। অর্থাৎ নবীর কাছ থেকে রেসালতের প্রাপ্ত রসূল। এরা ছিল ওহি ব্যতীত রসূল। এ মর্মে আল্লাহ বলেন, "মা-আরছালনা মিন কাবলিকা মিনাররাসূলি" "ইল্লা 'নু' ওহিই ইলাইহি"। ইল্লা অর্থ ব্যতীত (আঃ অভিঃ পৃঃ ৪৬৪) হি- অর্থ সে বা তিনি, (আঃ অভিঃ পৃঃ ২২২৮)। তাহলে এই আয়াতের অর্থটি হল- "আমি কি তোমার পূর্বে এমন রসূল পাঠাইনি যাদের প্রতি ছিল না কোনো ওহী?" (সূরা আম্বিয়া : ২৫) অর্থাৎ তারা ছিল ওহি ব্যতীত রসূল। এরা শুধু এই কথাই প্রচার করে যে, লা-ইলাহা ইল্লাআনা 'ফা' তাবুদুনা (সূরা আম্বিয়া : ২৫)। আর কুরআন প্রচার করাই হচ্ছে রসূলের কাজ (সূরা মায়েদা : ৯৯)। অতএব প্রত্যেক রসূল নবী নহে এটা নিশ্চিত। পক্ষান্তরে প্রত্যেক নবীই রসূল। এ মর্মে আল্লাহ বলেন, ইল্লাল বালাগা মিনাল্লাহি ওয়া রিসালাতিহি। অর্থ নবীর উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে বাণী বা ওহী পৌঁছানোর পরে তাকে রিসালাত দেয়া হয়। (সূরা জিন : ২৩)। তাই প্রত্যেক নবী রসুল।
আমরা জানি নবী শেষ (সূরা আহযাব, ৪০ আয়াত) কিন্তু রসূল শেষ এমন কোনো আয়াত পবিত্র কোরআনে নেই। তারপরও যারা নবী শেষ (আহযাব, ৪০ আয়াত) এই আয়াত দিয়ে রসূলও শেষ মনে করেন তাদের কথায় প্রমাণ হয় যে, নবী ও রসূল একই পদ কিন্তু না, নবী ও রসূল এক পদ নয়। নবী এবং রসূল দুইটি পদ, নবী শব্দের অর্থ হচ্ছে ঐশী বাণী সহকারে প্রেরিত মহাপুরুষ বা ভবিষ্যৎ বক্তা। (আরবি অভিধান, পৃ. ২৩৬৩)। নবীর ইংরেজি শব্দ হচ্ছে, চৎড়ঢ়যবঃ (ইংরেজি অভিধান, পৃ. ৬১৬) পক্ষান্তরে রসূল শব্দ এসেছে রিসালাত থেকে। রিসালাত শব্দের অর্থ সংবাদ বা বার্তা বা পত্র (আরবি অভিধান, পৃষ্ঠা ১৩৫৪)। যার ইংরেজি হচ্ছে গধংংধমব (ইংরেজি অভিধান, পৃষ্ঠা ৪৪৩)। যিনি রিসালাত প্রচারের ভারপ্রাপ্ত হন তিনিই রসূল। আর তাই রসূলের ইংরেজি হচ্ছে গবংংবহমবৎ। কেবল প্রচার করাই হচ্ছে রসুলের কাজ। (মায়েদা, ৯৯ আয়াত)। অর্থাৎ নবী এবং রসূল ভিন্ন পদ, যাকে নবুয়ত দেওয়া হয় তিনিই নবী, যাকে রিসালাত দেওয়া হয় তিনিই রসূল। প্রত্যেক নবীকে নবুয়ত দেওয়া হয়েছে। (ইমরান, ৭৯ আয়াত)। প্রত্যেক নবীই সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে মিশাক প্রাপ্ত ও কিতাব প্রাপ্ত। (ইমরান, ৮১ আয়াত)। প্রত্যেক নবীর ওপর ওহি নাজিল হয়েছে (নিসা, ১৬৩ আয়াত)। প্রত্যেক নবীকে রিসালাত প্রচারের ভার অর্পণ করা হয়েছে। (জিন, ২৩ আয়াত)। এই আয়াতে বলা হয়েছে, ইল্লাল বালাগা মিনাল্লাহি ওয়া রিসালাতিহি। অর্থাৎ প্রত্যেক নবীর উপরে নবুয়ত অহী, কিতাব পৌঁছানোর পর তাকে আবার রিসালাতের ভার দেওয়া হয়েছে। এই আয়াতে 'বালাগা' শব্দ এসেছে, বালাগা শব্দ হচ্ছে, পয়গাম বা বার্তা। (আরবি অভিধান, পৃষ্ঠা ৭১৭)। যেহেতু প্রত্যেক নবীর উপরে নবুয়ত ও রিসালাত এসেছে সেহেতু প্রত্যেক নবীই রসূল। তাই বলা হয়েছে, নবীদের মধ্যে মর্যাদাগত কোনো পার্থক্য বা প্রকারভেদ নেই (বাকারা, ১৩৬ আয়াত)। আমরা জানলাম, নবী এবং রসূল দুইটি পদ। কাজেই নবী পদ শেষ হয়েছে এটা বলা হয়েছে। এই কথা দিয়ে 'রসূল শেষ' এটা প্রমাণ হয় নেই। কারণ নবী এবং রসূল ভিন্ন পদ। তবে নবীর উপর দুটি পদ, একটি হচ্ছে নবী, অপরটি হচ্ছে রসূল। নবী পদটি হস্তান্তরযোগ্য নয়। পক্ষান্তরে রসূল পদটি অর্থাৎ রিসালাতের বিষয়টি হস্তান্তরযোগ্য। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে রিসালাতের ভার অর্পণ করেন। (আনাম, ১২৪ আয়াত)। কারণ নবীর কাজ হচ্ছে কিতাব আনয়ন করা, আর রসূলের কাজ হচ্ছে কেবল তা প্রচার করা। (মায়েদা, ৯৯ আয়াত)। কাজেই কিতাব বা অহী একসময় বন্ধ হতে পারে, কিন্তু সেই কিতাব প্রচরের কাজ বন্ধ হতে পারে না। তাই কিতাব প্রচারের কাজ অব্যাহত রাখার জন্য রিসালাতের ভারটা হস্তান্তরযোগ্য রাখা হয়েছে। কারণ নবী সার্বক্ষণিক নয়, নবী আসে বিরতি দিয়ে, এক নবী আসার পরে কোনো কোন ক্ষেত্রে ৫০০/১০০০ বছর পরে আরেক নবী আসে। দুই নবীর মধ্যবর্তী পিরিয়ডে অর্থাৎ নবী যখন শেষ, তখন প্রচারের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য প্রত্যেক নবীর শেষাংশে একজনকে রিসালাতের ভার অর্পণ করে রসূল পদে রেখে গেছেন, যিনি তার কিতাবের সমর্থনকারী এবং বিশ্বস্ত। সেই রসূল রিসালাতের ভার তার পরবর্তী আর একজন সমর্থক ও বিশ্বস্ত ব্যক্তির কাছে অর্পণ করে রসূল পদটি সমাজে অব্যাহত রেখেই দ্বীন প্রচার কাজটা চালু রাখে, এরা হচ্ছে রিসালাত প্রাপ্ত শুধু রসূল, এরা নবী নয়। এদেরকে ফাতারাতি পিরিয়ডের রসূল বলে। যা মায়েদার ১৯ আয়াতে বলা হয়েছে।

রসূলের কোনো বিকল্প নেই

এখানে উল্লেখ্য যে, দ্বীনের ক্ষেত্রে উলামাগণকে কিংবা উলিল আমরগণকে কিংবা তাবলীগের আমিরগণকে কিংবা পীরগণকে আনুগত্য করলে সেই আনুগত্য রসূলের হবে এমন কোনো আয়াত পবিত্র কোরআনে নেই। তাছাড়া উলামা, উলিল আমর, আমির, পীর এই নামগুলো রসূলের গুণবাচক নাম এমন উল্লেখ পবিত্র কোরআনে নেই। এজন্য কোনো অবস্থায় ঐ উলামাগণ কিংবা উলিল আমরগণ কিংবা তাবলীগের আমিরগণ কিংবা পীরগণ রসূলের বিকল্প নয়। কারণ দ্বীনের ক্ষেত্রে রসূল ব্যতীত ৩য় কোন ব্যক্তির আনুগত্য করার কথা কোথাও উল্লেখ নেই। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, তোমার আল্লাহ বিশ্বাস কর ও রসূল বিশ্বাস কর, বলো না তিন। (সূরা নেছা-১৭১)। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে তোমরা রসূলের আনুগত্য করবে, এজন্য আমি রসূলই পাঠাই (নেছা, ৬৪ আয়াত)। এই আয়াতে প্রমাণ হয় যে, রসূলের কোনো বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয় নি।
আল্লাহ বলেন, দ্বীনের বিষয় সকল কিছু একমাত্র আল্লাহরই প্রাপ্য। (সূরা যুমার : ৩) রসূলের আনুগত্য করলে সে আনুগত্য আল্লাহর হয়। (সূরা নেসা : ৮০) তাই রসূলের আনুগত্য করলে সে আনুগত্য দ্বীনের আনুগত্যে গণ্য হয়। রসূল ব্যতীত দ্বীনের ক্ষেত্রে অন্য কোনো তৃতীয় ব্যক্তির আনুগত্য করলে শেরেক হবে। এই জন্য যে, রসূল ব্যতীত তৃতীয় কোনো ব্যক্তির আনুগত্য করলে সে আনুগত্য রসূলের হবে এমন কোনো আয়াত কোরআনে নেই। এই জন্য আল্লাহ বলেন, তোমরা আল্লাহ বিশ্বাস কর ও রসূল বিশ্বাস কর। বলিও না তিন। (সূরা নেসা : ১৭১)
যারা তিন পন্থী তারা বলে, আল্লাহ তো তিনের মধ্যে একজন। (সূরা মায়েদা: ৭৩) অতএব দ্বীনের ক্ষেত্রে একমাত্র রসূল ব্যতীত তৃতীয় কোনো ব্যক্তির আনুগত্য করলে সেটা শেরেকে গণ্য হবে এটা নিশ্চিত। অনেকেই দ্বীনের ক্ষেত্রে তাদের দলের আমিরগণের আনুগত্য করে থাকে। যেহেতু আমিরগণকে তারা রসূল জ্ঞান করে না। তাহলে দ্বীনের ক্ষেত্রে তাদের আমিরগণের আনুগত্য করলে সেটা শেরেকে গণ্য হবে। আবার যারা উলামাগণকে দ্বীনের ক্ষেত্রে আনুগত্য করে থাকে। যেহেতু তারা উলামাগণকে রসূল জ্ঞান করে না। সেহেতু একই যুক্তিতে উলামাগণকে বা আলেমগণকে বা দলের আমিরগণকে দ্বীনের ক্ষেত্রে আনুগত্য করে তারাও শেরেকে গণ্য। আবার যারা মসজিদের বেতনভুক্ত ইমামগণকে দ্বীনের ক্ষেত্রে আনুগত্য করে। যেহেতু মসজিদের ইমামগণকে তারা রসূল জ্ঞান করে না সেহেতু সেই একই যুক্তিতে ঐসকল ইমামগণের দ্বীনের ক্ষেত্রে আনুগত্য করাও শেরেকে গণ্য। আবার যারা দ্বীনের ক্ষেত্রে পীরগণকে আনুগত্য করে থাকে। যেহেতু তাদের পীরগণকে তারা রসূল হিসেবে বিশ্বাস করে না বিধায় সেই সকল তিনপন্থী পীরপন্থীগণও শেরেকে গণ্য। (বি.দ্র. তিনপন্থী পীরপন্থী শেরেকে গণ্য অধ্যায়ে বিস্তারিত দেখুন)। আবার যারা আল্লাহ সম্পর্কে ধারণা কল্পনা বা অনুমান করে সেটাও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ আল্লাহ সম্পর্কে ধারণা, কল্পনা ও অনুমান মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। (সূরা ইউনুস : ৩৬) এটা এই জন্য গ্রহণযোগ্য নয় যে, আপনি আল্লাহকে যেমনটি ধারণা করেন কিংবা যেমনটি অনুমান করেন আল্লাহ তো তেমনটি নহেন বিধায় আল্লাহ সম্পর্কে আপনার মস্তিষ্কের এই কাল্পনিক মূর্তিটি আল্লাহ সম্পর্কে একটি মেসেলে গণ্য হয়। আর আল্লাহ সম্পর্কে কোনো মেসেল দেওয়া যাবে না। (সূরা নহল : ৭৪) ফলে যারা আল্লাহর কাল্পনিক মূর্তি মস্তিষ্কে রেখে আল্লাহকে সেজদা করে সেটাও কোরআন মাফিক নয়। আবার যারা আল্লাহকে অনুমানের উপর বিশ্বাস করে কাবা ঘরে হজ করতে যান তাদের মস্তিষ্কে কাবা ঘরের ছবি সেজদার সময় স্থির হয়ে যায় কিংবা যারা কাবা ঘরের ছবিকে কল্পনায় এনে সেখানে সেজদা করে তাদের সেজদাও শেরেক হয়। কারণ আল্লাহ ছাড়া সেজদা হারাম। (সূরা জিন : ১৮) এই জন্য ওয়াসজুদুলি হেরেম শরিফ কিংবা ওয়াসজুদুলি মাকামে ইবরাহিম কিংবা ওয়াসজুদুলি বায়তুল্লাহ। অর্থাৎ তোমরা কাবা ঘরকে সেজদা কর কিংবা তোমরা মাকামে ইবরাহিমকে সেজদা কর, কিংবা তোমরা আল্লাহর ঘরকে সেজদা কর এমন আয়াত কোরআনে আসেনি। তবে আয়াতে এসেছে আত্তাখাযু মিন মাকামে ইবরাহিম মু-উছাল্লি। (সূরা বাকারা : ১২৫) তোমরা মাকামে ইবরাহিমকে উছাল্লি আদায় করার স্থান হিসেবে সাব্যস্ত কর। এখানে উল্লেখ্য যে, উছাল্লি আর সেজদা একশব্দ নয়। কারণ সেজদা হচ্ছে উপাসনামূলক শব্দ। আর উছাল্লি হচ্ছে প্রশংসামূলক শব্দ। কারণ আল্লাহ বান্দার জন্য উছাল্লি কামনা করে। (সূরা যুখরুফ : ৪৩) [বি.দ্র. এই পুস্তকের ২৪ নং অধ্যায়টি বিস্তারিত দেখুন] এই আয়াত অনুসারে মাকামে ইবরাহিমকে প্রভুর প্রশংসা গুণকীর্তন করার স্থান হিসেবে সাব্যস্ত করতে বলা হয়েছে। তবে সেটা সেজদার লক্ষ্যবস্তু নয়। এ জন্য যারা কাবা ঘরের ছবিকে সেজদার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে অন্তরে স্থির করে সেজদা করে তারাও শেরেকে গণ্য। আর এই ধরনের শেরেকযুক্ত মুশরিকদেরকে কাবা ঘরে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ আল্লাহ ঘোষণা করেন যে, মুশরিক (হাজী)দের দায় আল্লাহ নেবেন না কিংবা রসূলও তাদের দায়ভার নেবেন না। (সূরা তওবা : ৩) আবার যারা আল্লাহর সাথে অন্যদের নাম ডাকে তারাও শেরেকে গণ্য। কারণ আল্লাহ বলেন, তোমরা আল্লাহর সাথে কাউকে ডেক না। (সূরা জিন : ১৮) বর্তমানে এক শ্রেণীর লোক আছে, যারা কোনো মূর্তিপূজা করে না আবার কোনো দেবদেবীর উপাসনাও করে না। উহারা কেবল আল্লাহকেই প্রভু বলে বিশ্বাস করে। কিন্তু উহারা আল্লাহর সাথে মূসা (আ.) কিংবা ঈসা (আ.) কিংবা বিগত রসূলগণের নাম জপনা করে। সূরা জিনের ১৮ নং আয়াত অনুসারে তারাও শেরেকে গণ্য। যখন তাদের বলা হলো, তোমরা (শেরেক পথ পরিহার করে) পরিপূর্ণভাবে আল্লাহতে আত্মসমর্পণ কর। (সূরা বাকারা : ২০৮) কারণ আল্লাহতে আত্মসমর্পণ করাই আল্লাহর মনোনীত দ্বীন। (সূরা ইমরান : ৮৫) তখন তারা বলল, আমরা তো আমাদের দ্বীনেই আছি। তখন তাদেরকে বলা হল, তোমরা যে আল্লাহর সাথে তোমাদের রসূল ঈসা আ. ও মূসা (আ.) কিংবা বিগত রসূলগণের নাম জপনা করছ। ফলে তোমরা আল্লাহর সাথে তোমাদের রসূলের নাম জপনা করে শেরেকে গণ্য হচ্ছ। কিন্তু আল্লাহ বলেন, তোমরা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে ডেক না। (সূরা জিন : ১৮) তখন তারা বলল, এই যুক্তিতে আল্লাহর সাথে আমাদের রসূলের নাম জপনা করলে যদি শেরেক হয় তাহলে তোমরা যখন আল্লাহর সাথে তোমাদের রসূলের নাম ডাক তাহলে তো তোমরাও আমাদের মতো শেরেকে গণ্য। তাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ বলেন, কুল ইন্নানী বারিউন মিম্মা তুশরিকা। বল, তোমাদের মতো শেরেক থেকে আমি মুক্ত। (সূরা আনাম : ১৯) তখন তারা বলল, তোমাদেরটা কিভাবে শেরেক মুক্ত হয়? আমরা রসূল থেকে আল্লাহকে ংবঢ়ধৎবঃব না করে আল্লাহ ও রসূলকে একাকার ও অবিচ্ছিন্নভাবে বিশ্বাস করে অর্থাৎ সূরা আল-ফাতহ-এর ১০নং আয়াত অনুসারে রসূলের হাতই আল্লাহর হাত বিশ্বাস করি এ জন্য আমাদেরটা শেরেকমুক্ত। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, আল্লাযিনা ইয়াকফুরুনা বিল্লাহি ওয়া রুসুলিহি ওয়া উরিদুনা আইয়ু র্ফারিকু বায়নাল্লাহা ওয়া রুসুলিহি (অর্থাৎ উহারাই আল্লাহ ও রসুল অস্বীকারকারী যাহারা ইচ্ছাকৃতভাবে রসুল থেকে আল্লাহকে ফারাক করে অর্থাৎ রসুল থেকে আল্লাহকে ংবঢ়ধৎবঃব করে বা ফবংঃবহপব করে অর্থাৎ পৃথক করে বা দূরত্ব করে (সূরা নেসা : ১৫০) অর্থাৎ এই আয়াত অনুসারে যারা রসূল থেকে আল্লাহকে ংবঢ়ধৎবঃব করে উহারাই আল্লাহ ও রসূল অস্বীকারকারী কাফের। পক্ষান্তরে যারা রসূল থেকে আল্লাহকে ংবঢ়ধৎবঃব করে না উহারাই মোমিন। এই মর্মে আল্লা আরো বলেন, ওয়া য়াল্লাজিনা আমানুবিল্লাহি ওয়া রসুলিহি ওয়া লাম উফারিরকু বায় আহাদা মিনহুম, উলাইকা সাওফা উতিহিম উযুরাহুম-বরং যারা আল্লার রসুল বিশ্বাস করে এবং উহাদের মধ্যে কোনো ফারাক করে না। অর্থাৎ রসুল থেকে আল্লাহকে ংবঢ়ধৎবঃব করে না বা ফবংঃবহপব) করে না অর্থাৎ পৃথক করে না বা দূরত্ব করে না। উহাদের জন্য রহিয়াছে পুরস্কার (সুরা নেসা আয়াত-১৫২)। এখানে উল্লেখ যে, এই আয়াত দিয়েই অনেকেই প্রমাণ করতে চায় যে, আল্লাহর রসুলের মধ্যে কোন ফরভবৎবহঃ বা পার্থক্য নেই। কিন্তু তাদের কথা ঠিক নহে কারণ আল্লাহ ও রসূলের মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য আছে। রসুল হচ্ছে সৃষ্ট আল্লাহ হচ্ছে শ্রষ্ঠা। রসুলের জন্ম-মৃত্যু আছে পক্ষান্তরে আল্লাহর জন্ম-মৃত্যু নেই। রসুলের সাথে আল্লাহ আছে। অর্থাৎ রসূল হচ্ছে আল্লাহর সংশ্লিষ্ট। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া রসূল চলতে পারে না পক্ষান্তরে আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নহে আল্লাহ একক। তবে এই আয়াতের উদ্দেশ্য হবে রসুলের সাথে আল্লাহ আছে বিধায় রসুল থেকে আল্লাহকে পৃথক না করে অর্থাৎ ংবঢ়ধৎবঃব না করে আল্লাহ ও রসুল বিশ্বাস করা। আল্লাহ ও রসূলকে একাকার ও অবিচ্ছিন্নভাবে বিশ্বাস করা। রসূলের হাতই আল্লাহর হাত (সূরা আল-ফাতহ-১০) অর্থাৎ রসূল সুরতে আল্লাহ বিশ্বাস করে সেজদা দিলে রসূল সুরতে, স্বপ্নে আল্লাহর দর্শন হয়। কারণ ইবলিশ যেহেতু আদম সেজদার সামিল হয় না (সূরা হিজর-৩৩) সেহেতু স্বপ্নে আদম সেজদাকারীর চেহারায় ইবলিশ আসে না। তখন কিন্তু রসূল সুরতে স্বপ্নে, রসূলও আসে নাই ইবলিশও আসে নাই। রসূল সুরতে স্বপ্নে স্বয়ং আল্লাহই আসে। এ মর্মে লালন সাইজি তাঁর গানের ভাষায় বলেছে-যিনি মুর্শিদ/গুরু তিনি রসুল, ইহাতে নাই কোনো ভুল। খোদাও সে হয়, এ কথা বলে না লালন কোরানে কয়। এবার এই মর্মে আল্লাহ বলেন তোমরা যখন রসূলের কাছে যাবে তখন তোমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এমনটি থাকবে যে আমরা তো আল্লাহর কাছেই গেলাম। যখন তোমরা রসূলের কাছে বায়াত গ্রহণ করবে তখন তো আল্লাহর কাছেই বায়াত গ্রহণ করলে। (সূরা ফাতহ : ১০) কারণ তাদের হাতের উপরই আল্লাহর হাত। (সূরা ফাতহ : ১০) আর এই মর্মে আল্লাহ বলেন, তোমরা যেখানেই থাক না কেন আমি তোমাদের সাথে আছি। (সূরা হাদিদ : ৪)। আল্লাহ তো রসূলের ভেতরই সক্রিয় আছেন। (সূরা আনফাল : ১৭) আল্লাহ মানুষের গর্দানের শাহ রগ অপেক্ষাও নিকটে। (সূরা কাফ : ১৬) (বি. দ্র. একত্ববাদের দ্বীন অধ্যায় ও আল্লাহর অবস্থান সর্বত্রই অধ্যায় বিস্তারিত দেখুন) আল্লাহ মানুষের অতি নিকটে (সুরা বাকারা-১৮৫) যিনি মুর্শিদ/গুরু তিনি রসুল। (বি.দ্র.এই মর্মে সম্যকগুরুই রসুল অধ্যায় বিস্তারিত দেখুন।) অতএব রসূল থেকে আল্লাহকে ফারাক না করে রসূল সুরতে আল্লাহ বিশ্বাস করাই একত্মবাদে দ্বীন। এখানে উল্লেখ্য যে, ফারাক শব্দ অর্থ পৃথক করা। (আরবী অভিধান পৃ. নং ১৮৭৯) আর পৃথক শব্দের ইংরেজি হচ্ছে ঝবঢ়ধৎধঃব। (ইংরেজি অভিধান পৃ. নং ৭০৩) যেটার অর্থ উরংঃধহপব বা দূরত্ব করা বুঝায়। অর্থাৎ সূরা নেসার ১৫০ নং আয়াতের ভাবার্থ হচ্ছে রসূল থেকে আল্লাহ ঝবঢ়ধৎধঃব বা উরংঃধহপব না করে বিশ্বাস করা। বরং রসূলের হাত আল্লাহর হাত বিশ্বাস করে রসূলের মধ্যে ব্যক্তি রসূলকে বিলীন করে সেই সুরতে আল্লাহ বিশ্বাস করে সেখানে আল্লাহকে বর্তমান জেনে সেজদা করা হয়। এটাই হচ্ছে রসূলের মাধ্যমে ঈমান পরীক্ষা করা। (সূরা ফুরকান : ২০) উপরোক্ত আলোচনায় দেখা গেলো যারা রসুল থেকে আল্লাহকে ফারাক করে বা ঝবঢ়ধৎধঃব (পৃথক) করে উহারা সুরা নেসার ১৫০নং আয়াত অনুসারে আল্লাহ ও রসুলকে অস্বীকারকারী বলে গণ্য। তাই উহারা যখনই রসুল থেকে আল্লাহকে ঝবঢ়ধৎধঃব বা পৃথক করে তখনই উহারা আল্লাহর সাথে রসুলের নাম জপনা করে। ফলে উহারা সুরা জিনের ১৮নং আয়াত অমান্যকারী বলে গণ্য হয়। (কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে তোমরা আল্লাহর সাথে কাউকে ডেকো না।) রসূলের সুরতে আল্লাহ বিশ্বাস করা এটাই ঈমানের একটা পরীক্ষা, সেই পরীক্ষায় লেবাসধারী মোমিনগণও আক্রান্ত হয়। এই পরীক্ষা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, এমন একটি কঠিন পরীক্ষা করা হবে যে পরীক্ষায় শুধু জালেমরাই আক্রান্ত হবে না। (সূরা আনফাল : ২৫) এইভাবে আমরা রসূল সুরতে আল্লাহ বিশ্বাস করছি বিধায় আমাদেরটা শেরেকমুক্ত। কারণ রসূলের মধ্যে রসূলকে বিলীন করে সেখানে যে আল্লাহর অবস্থান আছে। রসূল সুরতে সেই আল্লাহকেই সেজদা করছি। রসূলকে করছি না। বা আল্লাহর সাথে রসূলকে ডাকছি না। আর এটা আমাদের পক্ষে এইজন্য সম্ভব হচ্ছে যে, সম্যকগুরুই আমাদের রসূল। কাজেই আমাদের রসূল তো বর্তমান বা উপস্থিত আছে। যেহেতু তোমরা তো মুসা (আ.)কে কিংবা ঈসা (আ.)কে কিংবা অনুপস্থিত রসূলগণকে রসূল হিসাবে বিশ্বাস কর। কিন্তু বর্তমান সম্যক গুরুকে রসূল হিসাবে বিশ্বাস কর না। আর তোমাদের রসূল তো বর্তমানে নেই। তাহারা অনুপস্থিত। এইজন্য তোমরা রসূলের হাতের স্পর্শ লাভ করতে পারছ না বিধায় তোমাদের ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে রসূলের নাম ডাকা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। ফলে তোমরা আল্লাহর সাথে রসূলের নাম জপনা করে সূরা জিনের ১৮ নং আয়াতের পরিপন্থী গণ্য। তাই সম্যকগুরুকে রসূল বিশ্বাস করেই সেখানে বায়আত গ্রহণের মাধ্যমে একত্মবাদের দ্বীনের পৌঁছানোই একমাত্র উপায়। তাই এই রসূলের কোনো বিকল্প নেই। এইজন্য সম্যকগুরুকে রসূল বিশ্বাস করে সেই রসূল সুরতে আল্লাহকে সেজদা করা শেরেক মুক্তির একমাত্র পথ। এই পথে না এসে যারা ঈসা (আ.)কে কিংবা মুসা (আ.)কে কিংবা অনুপস্থিত রসূলগণকে রসূল হিসাবে বিশ্বাস করে আল্লাহর সাথে ঈসা (আ.) ও মুসা (আ.) কিংবা অনুপস্থিত রসূলের নাম জপনা করে তারা শেরেকের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, শেরেক করলে কর্ম নিষ্ফল হয়। (সূরা যুমার : ৬৫) শেরেক সবচেয়ে বড় জুলুম। (সূরা লোকমান : ১৩) শেরেক করলে ঈমান কলুষিত হয়। তাই আল্লাহ বলেন, তোমাদের ঈমানকে জুলুম দ্বারা কলুষিত করো না। (সূরা আনাম : ৮২) শেরেকের অপরাধ কখনোই ক্ষমা করা হবে না। (সূরা নেসা : ৪৮)
আর যারা সম্যকগুরুকে রসূল বিশ্বাস করে তার সঙ্গ ধারণ করে একত্মবাদের দ্বীনে পৌঁছলো তারা শেরেক থেকে মুক্তি পাবে এই জন্য যে, সম্যকগুরুই রসূল। [বি.দ্র. সম্যকগুরু রসূল অধ্যায় বিস্তারিত দেখুন] আর রসূলের আনুগত্য করলে সে আনুগত্য আল্লাহর হয়। (সূরা নেসা : ৮০) এজন্য সম্যকগুরুকে রসূল বিশ্বাস করে তার আনুগত্যকারীগণ শেরেকমুক্ত। আর যারা সম্যকগুরুকে রসূল বিশ্বাস না করে অনুপস্থিত রসূলগণকে বিশ্বাস করে সম্যকগুরুকে তথা এই রসূলের সঙ্গ ধারণ না করে মারা গেল তখন তারা আফসোস করে বলবে, হায় আমরা যদি রসূলের সঙ্গ ধারণ করতাম! (সূরা ফুরকান : ২৭) দ্বীনের ক্ষেত্রে রসূলের কোনো বিকল্প নেই। অর্থাৎ রসূর ব্যতীত শেরেক মুক্তির কোন উপায় নেই।

নবী শেষ কিন্তু রসূল শেষ এমন আয়াত কুরআনে উল্লেখ নেই

আমরা জানি নবী শেষ (আহযাব, ৪০ আয়াত) কিন্তু রসূল শেষ এমন কোনো আয়াত পবিত্র কোরআনে নেই। তারপরও যারা নবী শেষ (আহযাব, ৪০ আয়াত) এই আয়াত দিয়ে রসূলও শেষ মনে করেন তাদের কথায় প্রমাণ হয় যে, নবী ও রসূল একই পদ কিন্তু না, নবী ও রসূল এক পদ নয়। নবী এবং রসূল দুইটি পদ, নবী শব্দের অর্থ হচ্ছে ঐশী বাণী সহকারে প্রেরিত মহাপুরুষ বা ভবিষ্যৎ বক্তা। (আরবি অভিধান, পৃষ্ঠা ২৩৬৩)। নবীর ইংরেজি শব্দ হচ্ছে, চৎড়ঢ়যবঃ (ইংরেজি অভিধান, পৃষ্ঠা ৬১৬) পক্ষান্তরে রসূল শব্দ এসেছে রিসালাত থেকে। রিসালাত শব্দের অর্থ সংবাদ বা বার্তা বা পত্র (আরবি অভিধান, পৃষ্ঠা ১৩৫৪)। যার ইংরেজি হচ্ছে গধংংধমব (ইংরেজি অভিধান, পৃষ্ঠা ৪৪৩)। যিনি রিসালাত প্রচারের ভারপ্রাপ্ত হন তিনিই রসূল। আর তাই রসূলের ইংরেজি হচ্ছে গবংংবহমবৎ। কেবল প্রচার করাই হচ্ছে রসুলের কাজ। (মায়েদা, ৯৯ আয়াত)। অর্থাৎ নবী এবং রসূল ভিন্ন পদ, যাকে নবুয়ত দেওয়া হয় তিনিই নবী, যাকে রিসালাত দেওয়া হয় তিনিই রসূল। প্রত্যেক নবীকে নবুয়ত দেওয়া হয়েছে। (ইমরান, ৭৯ আয়াত)। প্রত্যেক নবীই সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে মিশাক প্রাপ্ত ও কিতাব প্রাপ্ত। (ইমরান, ৮১ আয়াত)। প্রত্যেক নবীর ওপর ওহি নাজিল হয়েছে (নিসা, ১৬৩ আয়াত)। প্রত্যেক নবীকে রিসালাত প্রচারের ভার অর্পণ করা হয়েছে। (জিন, ২৩ আয়াত)। এই আয়াতে বলা হয়েছে, ইল্লাল বালাগা মিনাল্লাহি ওয়া রিসালাতিহি। অর্থাৎ প্রত্যেক নবীর উপরে নবুয়ত অহী, কিতাব পৌঁছানোর পর তাকে আবার রিসালাতের ভার দেওয়া হয়েছে। এই আয়াতে 'বালাগা' শব্দ এসেছে, বালাগা শব্দ হচ্ছে, পয়গাম বা বার্তা। (আরবি অভিধান, পৃষ্ঠা ৭১৭)। যেহেতু প্রত্যেক নবীর উপরে নবুয়ত ও রিসালাত এসেছে সেহেতু প্রত্যেক নবীই রসূল। তাই বলা হয়েছে, নবীদের মধ্যে মর্যাদাগত কোনো পার্থক্য বা প্রকারভেদ নেই (বাকারা, ১৩৬ আয়াত)। আমরা জানলাম, নবী এবং রসূল দুইটি পদ। কাজেই নবী পদ শেষ হয়েছে এটা বলা হয়েছে। এই কথা দিয়ে 'রসূল শেষ' এটা প্রমাণ হয় নেই। কারণ নবী এবং রসূল ভিন্ন পদ। তবে নবীর উপর দুটি পদ, একটি হচ্ছে নবী, অপরটি হচ্ছে রসূল। নবী পদটি হস্তান্তরযোগ্য নয়। পক্ষান্তরে রসূল পদটি অর্থাৎ রিসালাতের বিষয়টি হস্তান্তরযোগ্য। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে রিসালাতের ভার অর্পণ করেন। (আনাম, ১২৪ আয়াত)। কারণ নবীর কাজ হচ্ছে কিতাব আনয়ন করা, আর রসূলের কাজ হচ্ছে কেবল তা প্রচার করা। (মায়েদা, ৯৯ আয়াত)। কাজেই কিতাব বা অহী একসময় বন্ধ হতে পারে, কিন্তু সেই কিতাব প্রচরের কাজ বন্ধ হতে পারে না। তাই কিতাব প্রচারের কাজ অব্যাহত রাখার জন্য রিসালাতের ভারটা হস্তান্তরযোগ্য রাখা হয়েছে। কারণ নবী সার্বক্ষণিক নয়, নবী আসে বিরতি দিয়ে, এক নবী আসার পরে কোনো কোন ক্ষেত্রে ৫০০/১০০০ বছর পরে আরেক নবী আসে। দুই নবীর মধ্যবর্তী পিরিয়ডে অর্থাৎ নবী যখন শেষ, তখন প্রচারের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য প্রত্যেক নবীর শেষাংশে একজনকে রিসালাতের ভার অর্পণ করে রসূল পদে রেখে গেছেন, যিনি তার কিতাবের সমর্থনকারী এবং বিশ্বস্ত। সেই রসূল রিসালাতের ভার তার পরবর্তী আর একজন সমর্থক ও বিশ্বস্ত ব্যক্তির কাছে অর্পণ করে রসূল পদটি সমাজে অব্যাহত রেখেই দ্বীন প্রচার কাজটা চালু রাখে, এরা হচ্ছে রিসালাত প্রাপ্ত শুধু রসূল, এরা নবী নয়। এদেরকে ফাতারাতি পিরিয়ডের রসূল বলে। যা মায়েদার ১৯ আয়াতে বলা হয়েছে।

সম্যক গুরুগণই রসূল

আমরা জানি নবী শেষ (আহযাব, ৪০ আয়াত) কিন্তু রসূল শেষ এমন কোনো আয়াত পবিত্র কোরআনে নেই। তারপরও যারা নবী শেষ (আহযাব, ৪০ আয়াত) এই আয়াত দিয়ে রসূলও শেষ মনে করেন তাদের কথায় প্রমাণ হয় যে, নবী ও রসূল একই পদ। কিন্তু না, নবী ও রসূল এক পদ নয়। নবী এবং রসূল দুইটি পদ, নবী শব্দের অর্থ হচ্ছে ঐশী বাণী সহকারে প্রেরিত মহাপুরুষ বা ভবিষ্যৎ বক্তা। (আরবি অভিধান, পৃষ্ঠা ২৩৬৩)। নবীর ইংরেজি শব্দ হচ্ছে, চৎড়ঢ়যবঃ (ইংরেজি অভিধান, পৃষ্ঠা ৬১৬) পক্ষান্তরে রসূল শব্দ এসেছে রিসালাত থেকে। রিসালাত শব্দের অর্থ সংবাদ বা বার্তা বা পত্র (আরবি অভিধান, পৃষ্ঠা ১৩৫৪)। যার ইংরেজি হচ্ছে গধংংধমব (ইংরেজি অভিধান, পৃষ্ঠা ৪৪৩)। যিনি রিসালাত প্রচারের ভারপ্রাপ্ত হন তিনিই রসূল। আর তাই রসূলের ইংরেজি হচ্ছে গবংংবহমবৎ। কেবল প্রচার করাই হচ্ছে রসুলের কাজ। (মায়েদা, ৯৯ আয়াত)। অর্থাৎ নবী এবং রসূল ভিন্ন পদ, যাকে নবুয়ত দেওয়া হয় তিনিই নবী, যাকে রিসালাত দেওয়া হয় তিনিই রসূল। প্রত্যেক নবীকে নবুয়ত দেওয়া হয়েছে। (ইমরান, ৭৯ আয়াত)। প্রত্যেক নবীই সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে মিশাক প্রাপ্ত ও কিতাব প্রাপ্ত। (ইমরান, ৮১ আয়াত)। প্রত্যেক নবীর ওপর ওহি নাজিল হয়েছে (নিসা, ১৬৩ আয়াত)। প্রত্যেক নবীকে রিসালাত প্রচারের ভার অর্পণ করা হয়েছে। (জিন, ২৩ আয়াত)। এই আয়াতে বলা হয়েছে, ইল্লাল বালাগা মিনাল্লাহি ওয়া রিসালাতিহি। অর্থাৎ প্রত্যেক নবীর উপরে নবুয়ত অহী, কিতাব পৌঁছানোর পর তাকে আবার রিসালাতের ভার দেওয়া হয়েছে। এই আয়াতে 'বালাগা' শব্দ এসেছে, বালাগা শব্দ হচ্ছে, পয়গাম বা বার্তা। (আরবি অভিধান, পৃষ্ঠা ৭১৭)। যেহেতু প্রত্যেক নবীর উপরে নবুয়ত ও রিসালাত এসেছে সেহেতু প্রত্যেক নবীই রসূল। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, তোমার প্রতি যাহা ওহী নাযিল হয়, তুমি তাহা প্রচার কর। (সূরা মায়েদা : ৬৭) আর নবীদের উপর প্রচারের ভার আছে তাই প্রত্যেক নবীই রসূল। তাই বলা হয়েছে, নবীদের মধ্যে মর্যাদাগত কোনো পার্থক্য বা প্রকারভেদ নেই (বাকারা, ১৩৬ আয়াত)। আমরা জানলাম, নবী এবং রসূল দুইটি পদ। কাজেই নবী পদ শেষ হয়েছে এটা বলা হয়েছে। এই কথা দিয়ে 'রসূল শেষ' এটা প্রমাণ হয় নেই। কারণ নবী এবং রসূল ভিন্ন পদ। তবে নবীর উপর দুটি পদ, একটি হচ্ছে নবী, অপরটি হচ্ছে রসূল। নবী পদটি হস্তান্তরযোগ্য নয়। পক্ষান্তরে রসূল পদটি অর্থাৎ রিসালাতের বিষয়টি হস্তান্তরযোগ্য। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে রিসালাতের ভার অর্পণ করেন। (আনাম, ১২৪ আয়াত)। কারণ নবীর কাজ হচ্ছে কিতাব আনয়ন করা (সুরা ইমরান-৮১), আর রসূলের কাজ হচ্ছে কেবল তা প্রচার করা। (মায়েদা, ৯৯ আয়াত)। কাজেই কিতাব বা অহী একসময় বন্ধ হতে পারে, কিন্তু সেই কিতাব প্রচরের কাজ বন্ধ হতে পারে না। তাই কিতাব প্রচারের কাজ অব্যাহত রাখার জন্য রিসালাতের ভারটা হস্তান্তরযোগ্য রাখা হয়েছে। কারণ নবী সার্বক্ষণিক নয়, নবী আসে বিরতি দিয়ে, এক নবী আসার পরে কোনো কোন ক্ষেত্রে ৫০০/১০০০ বছর পরে আরেক নবী আসে। দুই নবীর মধ্যবর্তী পিরিয়ডে অর্থাৎ নবী যখন শেষ, তখন প্রচারের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য প্রত্যেক নবীর শেষাংশে একজনকে রিসালাতের ভার অর্পণ করে রসূল পদে রেখে গেছেন, যিনি তার কিতাবের সমর্থনকারী এবং বিশ্বস্ত। সেই রসূল রিসালাতের ভার তার পরবর্তী আর একজন সমর্থক ও বিশ্বস্ত ব্যক্তির কাছে অর্পণ করে রসূল পদটি সমাজে অব্যাহত রেখেই দ্বীন প্রচার কাজটা চালু রাখে, এরা হচ্ছে রিসালাত প্রাপ্ত শুধু রসূল, এরা নবী নয়। এদেরকে ফাতারাতি পিরিয়ডের রসূল বলে। যা মায়েদার ১৯ আয়াতে বলা হয়েছে।
কোন নবী যাতে তাঁর শেষাংশে রিসালাতের ভার অর্পণ করে রসূল রেখে যেতে দায়বদ্ধ থাকে। সেই লক্ষে প্রত্যেক নবীর কাছ থেকে রুহানী জগতে আল্লাহ এই মর্মে অঙ্গিকার নিয়েছিল যে, তোমার কাছে তোমার কিতাবের সমর্থক রূপে যখন রসূল আসবে তখন, তুমি তাকে বিশ্বাস করবে এবং অবশ্যই (রিসালাত দিয়ে) সাহায্য করবে। (ইমরান, ৮১ আয়াত)। প্রত্যেক নবী এই অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিল। আর তাই, এই আয়াতের অঙ্গিকার অনুসারেই প্রত্যক নবীর পরেই একজন রসূলের অস্তিত্ব আছে প্রমাণ হয়। যেহেতু নবী মোহাম্মদ (স.)ও একই অঙ্গিকারে আবদ্ধ (আহাযাব, ৭আয়াত)। নবী মোহাম্মদ (স.) যেহেতু নবী তাহলে ইমরানের ৮১ আয়াত অনুসারে প্রত্যেক নবীর পরই একজন রসূল থাকিলে সেই মোতাবেক নবী মোহাম্মদ (স.) এর পরে আরেকজন রসূল আছে, এটা প্রমাণ হয়, আর সেই রসূল কে, কী তার পরিচয়? এটাই আমরা জানব। নবী মোহাম্মদ (স.) যাকে রিসালাতের ভার অর্পণ করেছেন। তিনি হলেন রিসালাত প্রাপ্ত রসূল। তিনি কিন্তু নবী নহেন। তাঁর দায়িত্ব হচ্ছে নবী মোহাম্মদ (স.) এর রেখে যাওয়া পবিত্র কোরআন প্রচার করা। যেহেতু নবী মোহাম্মদ (স.) এর পর থেকে নবুয়ত শেষ কিন্তু রিসালাতের ধারা অব্যাহত থাকবে রোজ কিয়ামত পর্যন্ত। কারণ সার্বক্ষণিকভাবে ইবলিস সক্রিয় আছে। আর তাই ইবলিসকে প্রতিহত করার জন্য রসূল ব্যবস্থাকে অব্যাহত রাখা হয়েছে। এজন্য তাগুত ইবলিসকে বর্জন করে মানুষকে আল্লাহর ইবাদত করার নির্দেশ দেওয়ার জন্য আল্লাহ রসূল পাঠায়। (নহল, ৩৬ আয়াত)। প্রত্যেক নবীর পর থেকেই রসূলের উপস্থিতি ইঙ্গিত পাওয়া যায় ইমরানের ৮১ আয়াতে। আর যদি কোনো অবস্থায় নবী মোহাম্মদ (স.) তার পরে কাউকে রেসালাতের ভার দিয়ে বিশ্বস্ত কোনো রসূলকে সাহায্য করে রসূল না রেখে যান, তাহলে তিনি ইমরানের ৮১ আয়াতের অঙ্গিকার ভঙ্গ করেছেন, প্রমাণ হয়। কিন্তু না, তিনি কোনো সময় অঙ্গিকার ভঙ্গ করেন নি, বরং তার উম্মতের মধ্য থেকে যারা ইমান এনেছে এবং সৎ কর্ম করেছে তাদের মধ্য থেকে বিশ্বস্ত একজনকে রসূল পদে স্থলাভিসিক্ত করেছেন। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, পৃথিবীতে যারা ইমান আনবে এবং সৎ কর্ম করবে তাদের মধ্যথেকে রসূল পদে স্থলাভিসিক্ত নির্ধারণ করা হয়। (নূর, ৫৫ আয়াত)। এই আয়াতে খলিফা শব্দ এসেছে, খলিফা শব্দের অর্থ স্থলাভিসিক্ত করা। (আরবি অভিধান পৃ. ১২৬৬)। এখানে উল্লেখ্য যে, রসূল পদে স্থলাভিসিক্ত করার প্রক্রিয়া হচ্ছে রিসালাতের ভার অর্পণ করার মাধ্যমে। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে রিসালাতের ভার অর্পণ করে থাকেন। (আন আম, ১২৪ আয়াত)। কাজেই দেখা যাচ্ছে, নবী মোহাম্মদ (স.), ইমরানের ৮১ আয়াতের অঙ্গীকার অনুসারে, নুরের ৫৫ আয়াত মোতাবেক ও আনামের ১২৪ আয়াতের প্রক্রিয়া অনুসারে, তাঁর বিশ্বস্ত সাহাবী হযরত আলী (রাঃ) এর উপর রিসালাতের ভার দিয়ে রসূল পদে স্থলাভিসিক্ত করে গেছেন। হযরত আলী রিসালাত প্রাপ্ত শুধু রসূল, তিনি কিন্তু নবী নয়। হযরত আলী তার শেষাংশে একই প্রক্রিয়ায় হযরত হাসান বসরী (র.) কাছে রিসালাতের ভার অর্পণ করেন। একই প্রক্রিয়ায় ধারাবাহিক ভাবে রিসালাতের ভার অর্পনের মাধ্যমে রসূলের ধারা বর্তমান পর্যন্ত অব্যাহত আছে। তারই ধারাবাহিকতায়ই বর্তমান সমাজে রিসালাতের ভার প্রাপ্ত রসূলগণ দ্বীন প্রচারে আছেন, যেমনটি ধারাবাহিক ভাবে নবী মোহাম্মদ (স.) এর পূর্বে দ্ইু নবীর মধ্যবর্তী ফাতারাতির সময়কালে যে প্রকিয়ায় রসূল পাঠিয়েছে যা মায়েদার ১৯ আয়াতে ইঙ্গিত আছে, তেমনি নবী শেষ হওয়ার পর এটাও একটা ফাতারাতি সময়কাল। ইতিপূর্বে ফাতারাতি সময়কালে যে নিয়মে রসূলের ধারা চালু ছিল এখনও ঠিক একই প্রক্রিয়ায় সেই রিসালাতের ধারা অব্যাহত থাকবে, কারণ আল্লাহর নিয়মের কোনো পরিবর্তন নেই, এই মর্মে আল্লাহ বলেন, (হে নবী মোহাম্মদ) (স.) তোমার পূর্বে রসূলগণের বিষয়ে যেমন নিয়ম ছিল তোমার ক্ষেত্রে একই নিয়ম। আমার নিয়মের কোনো পরিবর্তন নেই। (বনি ইসরাইল, ৭৭ আয়াত)। এই ধারা প্রবর্তনের রিসালত দিয়ে কাউকে রসূল হিসেবে না রেখে যান তাহলে সেই নবী রসূলকে জিজ্ঞাসা করা হবে (আরাফ, ৬ আয়াত)। এই পবিত্র কোরআন সার্বজনিন আর তাই পবিত্র কোরআনের দর্শনের প্রয়োগ ও ব্যবহার সার্বজনিন ও সার্বক্ষণিক হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই বিধায় একই ধারাবাহিকতায় রিসালাতের ধারা বর্তমানে অব্যাহত আছে এবং থাকবে। কাজেই নবী শেষ, কিন্তু রসূল শেষ নয়। নবী পদ হস্তান্তরযোগ্য নয়, পক্ষান্তরে রসূল পদটি হস্তান্তরযোগ্য বিধায় রিসালাতের ভার হস্তান্তরের মাধ্যমে রসূলের ধারা অব্যাহত আছে। আর তাই রসূল চালু আছে। রিসালাতের ভার গ্রহণের মাধ্যমে যারা বর্তমান পর্যন্ত গুরুবাদী ধারায় আছে এরাই রসূল। এই সকল রসূলকে গুরু নামে ডাকা হয়। কারণ গুরু হচ্ছে রসূলের একটি গুণবাচক নাম। (বাকারা ১৫১ আয়াত এবং ইমরান, ১৬৪ আয়াত)। এই সকল আয়াতে আল্লীম শব্দ এসেছে, আর আল্লীম যিনি করেন তিনিই মুয়াল্লীম। মুয়াল্লীম শব্দের অর্থ গুরু, আরবি অভিধান পৃষ্ঠা ২২৭০), দিশারি অভিধান পৃষ্ঠা ১০৫)। বর্তমান রসূলগণকে গুরু নামেই ডাকা হয়, তাই সম্যক গুরুগণই রসূল। সম্যক গুরুগণকে রসূল হিসেবে বিশ্বাস করেই দ্বীনের ক্ষেত্রে তাদের আনুগত্য করাই হচ্ছে একমাত্র সঠিক পথ। পূর্ব আলোচনায় আমরা জানলাম, যেহেতু রসূলের ধারা অব্যাহত আছে, আবার রসূলের কোনো বিকল্প নেই, সেহেতু সম্যক গুরুরগণই রসূল, আর এই রসূলদেরকে বিশ্বাস করতে হবে। নবী মোহাম্মদ (স:) এর পূর্বেও একই প্রক্রিয়ায় রসুল এসেছে যারা দুই নবীর মধ্যবর্তী ফাতারাতি পিরিয়ডে রসুল হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছে (সূরা মায়েদা-১৯)। এই রসূলের আনুগত্যও অনুসরণের মাধ্যমেই আল্লাহকে আনুগত্য ও ভালবাসতে হবে (নিসা, ৮০ আয়াত ও (ইমরান, ৩১ আয়াত)। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, তোমরা এই রসূলের অনুসরণ কর (ইমরান, ৫৩ আয়াত)। রসূলের আনুগত্য করলেই আল্লাহর আনুগত্য হবে। (নিসা, ৮০ আয়াত) রসূলের আনুগত্য করলেই নবী (স.)কে পাওয়া যাবে। (নিসা, ৬৯ আয়াত)। রসূলের আনুগত্য করলেই জান্নাত পাওয়া যাবে (আল-ফাতহ্, ১৭ আয়াত)। রসূলের আনুগত্য করলেই কর্মফল বিনষ্ট হবে না (হুজরাত ১৪ আয়াত)। রসূলের আনুগত্য করলেই আল্লাহর কৃপা লাভ হবে (ইমরান, ১৩২ আয়াত)। রসূলের আনুগত্য করলেই সফলকাম হওয়া যাবে (র্নূ, ৫২ আয়াত)। রসূলের আনুগত্য করলেই মহা সাফল্য অর্জন হবে (আহযাব, ৭১ আয়াত) রসূলের অনুসরণ করলে আল্লাহর ক্ষমা লাভ হবে (ইমরান, ৩১ আয়াত)। পক্ষান্তরে যারা রসূলের আনুগত্য না করল, তারা রসূলের আনুগত্যের বিনিময়ে যে সকল পুরস্কার আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছে তা তারা পাবে না। অর্থাৎ উপরিউক্ত অর্জনগুলি লাভ করতে পারবে না বিধায় সম্যক গুরু তথা রসূলের আনুগত্য করা আমাদের সকলের জন্য ফজয। রসূলের সাথে যারা বিরোধীতা করলো। তাদের জন্য কঠিন শাস্তি (আনফাল, ১৩ আয়াত)। যারা রসূলের বিশ্বাস না করল, তারা বিশ্বাসী নয় বিধায় তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে (আছর, ১ আয়াত)। সম্যক গুরুগণকে রসূল বিশ্বাসে বিশ্বাসী হয়ে গুরুবাদী ধারার প্রবর্তনের মাধ্যমেই রিসালাতের ধারা অব্যাহত আছে।
অনেকেই সম্যক গুরুকে রসূল মানতে রাজি নহে, এরা বলে ওহীর সাথে রসুলের সম্পর্ক। প্রত্যেক রসূলের উপর ওহী নাযিল হয়েছে। ওহী যখন শেষ রসূলও শেষ, তাদের এই কথা ঠিক নহে, কারণ প্রত্যেক রসূল ওহী প্রাপ্ত নহে। বরং প্রত্যেক নবী ওহী প্রাপ্ত। কারণ প্রত্যেক নবীই কিতাব প্রাপ্ত (ইমরান ঃ ৮১) আর ওহী ব্যতিত কোন কিতাব হতে পারে না বিধায় প্রত্যেক নবীই ওহী প্রাপ্ত এটা নিশ্চিত। আল্লাহ বলেন, আমি নবীদের উপরে ওহী নাযিল করি (সূরা নেসাঃ ১৬৩)। কারণ আল্লাহ নবীদের নবুয়ত দিয়েছেন বিধায় তারা নবী। আর নবীদের কে নবুয়ত দান করেছেন (ইমরান-৭৯)। তাহলে দেখা গেল প্রত্যেক নবীই নবুয়ত প্রাপ্ত ওহী প্রাপ্ত ও কিতাব প্রাপ্ত। আর নবীদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে নবুয়ত, ওহী এবং কিতাব পৌছানের পরে তাকে আবার রিসালাত দেওয়া হইল (সূরা জ্বীন- ২৩)। যাকে নবুয়ত দেওয়া হয় তিনি নবী। তাহলে দেখা গেল ওহীর সাথে নবীর সম্পর্ক। ওহী শেষ বিধায় নবীও শেষ (আহয়াব-৪০)। ওহীর সাথে সকল রসূলের সম্পর্ক নাও থাকতে পারে। রসূলের কাজ হচ্ছে ওহী প্রচার করা (মায়েদা-৯৯)। প্রচার কাজ শেষ হবে না বিধায় রসূল শেষ এমন আয়াত আসে নাই। কাজেই ওহী শেষ রসূল শেষ এমন কথার কোন ভিত্তি নেই। এখানে উল্লেখ যে, আর যাকে রিসালাত দেওয়া হয় তিনি রসূল। তাহলে দেখা গেল প্রত্যেক নবীই রসূল। কারণ প্রত্যেক নবীই ওহী প্রাপ্ত রিসালত প্রাপ্ত। আর তাই নবীদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। (বাকারা- ১৩৬) তাহলে দেখা গেল নবীদের উপর দুইটি পদ, একটি হচ্ছে নবী পদ, অপরটি হচ্ছে রসূল পদ। তবে নবী পদটা হস্তান্তযোগ্য নহে। পক্ষান্তরে রসূল পদটা হস্তান্তরযাগ্য (সূরা আনআম- ১২৪)। তাই প্রত্যেক নবীই তার শেষাংশে তাঁর বিশ্বস্থ এবং ঘনিষ্ট একজনকে রিসালত দিয়ে রসূল হিসাবে রেখে যাবেন। এই মর্মে নবীদের কাছ থেকে আল্লাহ অঙ্গীকার নিয়েছিলেন তোমার কাছে যখন একজন রসূল আসবে তখন তুমি তাদেরকে বিশ্বাস করবে ও সাহায্য করবে (ইমরান-৮১)। এই আয়াত অনুসারে নবীর পরেই একজন রসূল থেকে যাচ্ছে। অর্থাৎ নবীর কাছে যে রসূল পদটা সংরক্ষিত ছিল এটা তিনি হস্তান্তর করে রসূল রেখে গেলেন। এই রসূল কিন্তু নবী নহেন। কারণ নবী পদটি হস্তান্তরযোগ্য নহে বিধায় যাকে রিসালত দিয়ে সাহায্য করে রসূল হিসাবে রেখে গেলেন তার উপর নবুয়ত পদ নেই। এই রসূলগণ পরবর্তী নবী আসা পর্যন্ত অর্থাৎ দুই নবীর মধ্যবর্তী ফাতারাতি পিরিয়তে দায়িত্ব পালন করেন (মায়েদা-১৯)। কিংবা নবী যখন শেষ তখনও ঐ রসূলগণ দায়িত্ব পালন করবেন। এইভাবে পর্যায়ক্রমে রসূলের ধারা অব্যাহত আছে। (বাকারা-৮৭) এবং এইভাবে একের পর এক বিরতিহীন ভাবে রসূল চলবে। (মমিন-৪৪)। এখানে উল্লেখ্য যে, নবীগণ রসূল, এই রসূলগণ ওহী প্রাপ্ত (মায়েদা-৬৭)। কারণ এই রসূলগণ আল্লাহর কাছ থেকে সাহায্য প্রাপ্ত অর্থাৎ রিসালত প্রাপ্ত (সূরা জ্বীন- ২৩)। পক্ষান্তরে আর এক শ্রেণির রসূল আছেন, যে সকল রসূলগণ নবীর কাছ থেকে রিসালত প্রাপ্ত অর্থাৎ সাহায্য প্রাপ্ত (ইমরান-৮১)। এরা কিন্তু ওহী প্রাপ্ত রসূল নহেন। এরা নবী নহে। এই মর্মে আল্লাহ বলেন আমি কি পাঠাইনি তোমার পূর্বে এমন অনেক রসূল যারা নবী নহে (হজ্ব-৫২)? কারণ ইহাদের প্রতি ছিল না কোন ওহী। যেহেতু প্রত্যেক নবীই কিতাব প্রাপ্ত (ইমরান ৮১)। যেহেতু এই রসূলগণের প্রতি কোন ওহী ছিল না বিধায় এরা নবী নহে। এরা ছিল ওহী ব্যতীত রসূল। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, ওয়া মা আর সালনা মিন কাবলিকা মিনার রাসূলি ইল্লা 'নু' 'ওহী' ইলাইহি, আন্নাহু লা ইলাহা ইল্লা আনা ফা তাবুদুনা। অর্থ ঃ আমি কি পাঠাইনি তোমার পূর্বে এমন অনেক রসূল যাদের প্রতি ছিল না কোন ওহী। নিশ্চয় উহারা শুধু এই কথায় প্রচার করিত যে, "আমি ছাড়া কোন ইলাহা নেই। অতএব তোমরা আমারই ইবাদত কর" (সুরা আম্বিয়া ২৫)। আল্লাহ বলেন, ওয়া মা আরছালনা মিন কাবলিকা মিনার রসুলি ইল্লা-নু ওহীই ইলাইহি আন্নাহু লা-ইলাহা ইল্লা আনা ফা তাবুদুনা (আম্বিয়া-২৫)। এখানে মা শব্দের অর্থ না সূচক অথবা প্রশ্নবোধক (আ ঃ অভিঃ পৃঃ নং ২১৯৩) আরছালনা অর্থ আমি পাঠিয়েছি (আ ঃ অভিঃ পৃঃ নং ১৫২) কাবলিকা অর্থ তোমার পূর্বে (আ ঃ অভিঃ পৃঃ নং ১৯১৮) মিনার রসুলি - রসূলদের মধ্য হইতে। আন্না অর্থ নিশ্চয়তাবোধক অব্যয়, যাহা দুই বাক্যের মাঝখানে বসে, তার পরবর্তী খবরকে পেশ দেয়। (আ ঃ অভিঃ পৃঃ নং ৫১৬)। হু একটি সর্বনাম, যার অর্থ তিনি বা সে (আঃ দিশারী অভিঃ ১৯৪)। আর এই আয়াতে পূর্বের বাক্যে উল্লেখিত রসুলকে বোঝানো হইয়াছে। অর্থাৎ আন্নাহু শব্দটা দুই বাক্যের মাঝখানে বসে দুটি বাক্যকে আলাদা রেখে অর্থ করে, যেমন সুরা বাকারার ২৬ নং আয়াত এবং ৬৮ ও ৬৯ নং আয়াত আন্না শব্দ এই ভাবে ব্যবহৃত হইয়াছে। সেই অনুসারে এখানে এই আয়াতের আন্না শব্দ দিয়ে আয়াতের প্রথম অংশ, (আমি কি পাঠাইনি তোমার পূর্বে এমন অনেক রসূল, যাদের প্রতি ছিলনা কোন ওহী।) এই অংশটিকে ২য় অংশ থেকে (আমি ছাড়া কোন ইলাহা নেই। অতএব তোমরা আমার ইবাদত কর) আলাদা করা হয়েছে।
অনেকেই এই আয়াতটিকে প্রত্যেক নবীর উপর একটি কমন ওহী এসেছে এই অর্থে ব্যবহার করে। তাদের উদ্দেশ্য ঠিক নহে। কারণ প্রত্যেক নবীর উপর একটি কমন ওহী এসেছে এটা প্রকাশ করাই যদি এই আয়াতের উদ্দেশ্য হইত তাহলে আয়াতটিতে রসূল শব্দ না এসে নবী শব্দ আসতো। কারণ প্রত্যেক নবীই কিতাবপ্রাপ্ত (ইমরান ৮১)। আর নীবদের উপরতো ওহী নাযিল হয়েছে (সুরা নেসা ১৬৩)। যেহেতু সূরা আম্বিয়ার ২৫নং আয়াতে নবী শব্দ না এসে রসূল এসেছে বিধায় প্রমাণিত হয় যে, উক্ত আয়াতের উদ্দেশ্য কমন ওহী ব্যক্ত করা নহে এটা নিশ্চিত। উক্ত আয়াতটিকে কমন ওহীর আয়াত হিসেবে অর্থ না করার দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে এই যে, যদি আয়াতটিকে কমন ওহীর দিকে অর্থ করা হয়, তাহলে প্রমাণ হয় যে, ওহী ব্যতীত কোন রসূল নেই। সে ক্ষেত্রে উক্ত আয়াতটি, সূরা মায়েদার ১৯নং আয়াতের পরিপন্থি হয়। কারণ এই আয়াতের বলা হয়েছে দুই নবীর মধ্যবর্তী ফাতারাতি পিরিয়ডে যখন ওহী বিরতি ছিল তখনও রসূল ছিল। এরা ছিল ওহী ব্যতীত রসূল। কারণ ঈসা (আ.) এর পর থেকেই মোহাম্মদ (সা.) এর পূর্ব পর্যন্ত এই পাঁচশত বৎসর কোন ওহী ছিল না। অথচ এখানে রসূল ছিল। এটাই সূরা মায়েদার ১৯নং আয়াতে ইঙ্গিত আসছে। কাজেই যদি কেহ সূরা আম্বিয়ার ২৫নং আয়াতটি এমনভাবে অর্থ করে যে, ওহী ব্যতীত কোন রসূল ছিল না। সেক্ষেত্রে উক্ত আয়াতের সাথে সূরা মায়েদার ১৯নং আয়াতের বিরোধ হবে বিধায় সূরা আম্বিয়ার ২৫নং আয়াতটিকে কমন ওহীর দিকে অর্থ না করে বরং আয়াতের প্রকৃত যে উদ্দেশ্য, তোমার পূর্বে এমন অনেক রসূল পাঠিয়েছি যারা ওহী ব্যতীত রসূল। তাহলে উক্ত আয়াতটি পবিত্র কোরানের কোন আয়াতের সাথে পরস্পর বিরোধী হবে না এটা নিশ্চিত। তাছাড়াও উক্ত আয়াতটি কমন ওহীর দিকে অর্থ না করার তৃতীয় কারণ হচ্ছে এই যে, পূর্বে নাযিলকৃত ওহীকে বিশ্বাস করতে বলা হয়েছে (সূরা বাকারায় আয়াত নং-৪)। বিধায় একই ওহী বারবার কিংবা প্রত্যেক নবীর কাছে নাযিল হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না বরং একই ওহী প্রত্যেক রসূল প্রচার করতে পারবে এতে কোন সন্দেহ নেই বিধায় সূরা আম্বিয়ার ২৫নং আয়াতে যে সকল রসূলের কাছে কোন ওহী নাযিল হয়নি তাহারা পূর্বে নাযিলকৃত ওহীগুলিকে বিশ্বাস করে বারবার প্রচার করেছে তাহাই বলা হয়েছে। সেক্ষেত্রে পূর্বে নাযিলকৃত ওহী, 'আমি ছাড়া কোন ইলাহা নেই অতএব তোমরা আমার ইবাদত করো' সূরা আম্বিয়ার ২৫নং আয়াতের অর্থ এটাই।
তার পরেও সূরা আম্বিয়ার ২৫ নং আয়াতটিকে কমন ওহির দিকে অর্থ না করার প্রকৃত কারণ হচ্ছে এই যে, আরবী ব্যাকরণ থেকে জানা যায় বিশেষ্যের আগে ما (মা) শব্দ আসলে অর্থ হয় কী? যেমন مااسمك তোমার নাম কী? আর যখন একই বাক্যে ما (মা) এবং الا )ইল্লা) শব্দ আসে তখন সেটা না সূচক প্রশ্নবোধক হয়। এই ধরণের م (মা) কে م وصله মা-মাওচুলা বলে। যেমন ওয়া মা মুহাম্মাদিন ইল্লা রাসুলান। অর্থ মুহাম্মদ কী রসূল ব্যতীত নহে? (সুরা ইমরান ১৪৪) ওয়া মা আরসালনাকা ইল্লা রাহমাতাল্লিল আলামিন। অর্থ আমি কি একমাত্র তোমাকে পাঠাইনি জগতের জন্য রহমত স্বরূপ অন্যকে ব্যতিত? (আম্বিয়া-১০৭)। এই আয়াতে মা এবং ইল্লা শব্দ এসেছে বিধায় বাক্যের প্রথম অংশে না সূচক প্রশ্নবোধক অর্থ ব্যবহৃত হবে এবং পরের অংশে ইল্লা শব্দের অর্থ বহাল রেখে যে অর্থ আসে সে অর্থে আয়াতটিকে অর্থ করতে হবে। সেক্ষেত্রে আয়াতটির সরল অর্থ হয় আমি তোমাকে পাঠিয়েছি জগতের জন্য রহমত স্বরূপ। যেমন উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, আমি কি তোমার কাছে পাঠাইনি ছাত্রদের মধ্য থেকে এমন অনেক ছাত্র যারা ছিল কিতাব ব্যতিত? এক্ষেত্রে যেভাবেই অর্থ করি না কেন, এর প্রকৃত অর্থটা হবে এরকম-তোমার কাছে কিতাব ব্যতিত কিছু ছাত্র পাঠিয়েছি, এর বাইরে অর্থ করলে বাক্যের অর্থ বিপরীত হবে। সেক্ষেত্রে যদি কেহ প্রথম অংশের প্রশ্নবোধকটা উঠিয়ে দিয়ে অর্থ করে তখন অর্থ কিন্তু পরিবর্তন হয়ে বিপরীত দিকে চলে যায়। যেমন আমি তোমার কাছে কিতাব ব্যতিত কোন ছাত্র পাঠাইনি। বা আমি পাঠাইনি কোন ছাত্র কিতাব ব্যতিত। এখানে প্রশ্নবোধক শব্দ উঠিয়ে দেওয়ায় বাক্যের অর্থ বিপরীত হয়ে গেল। যেহেতু চিঠিতে প্রশ্নবোধক এসেছে আর সেক্ষেত্রে প্রশ্নবোধক বাদ দিলে যদি প্রকৃত অর্থ বিপরীত দিকে হয় তাহলে কোন অবস্থায় উক্ত বাক্যে প্রশ্নবোধক শব্দ বাদ দেওয়া যাবে না। ঠিক তদ্রুপ সূরা আম্বিয়ার ২৫ নং আয়াতে এসেছে 'ওযা মা আরসালনা মিন কাবলিকা মিনার রাসুলি ইল্লা নু ওহি ইলাইহি। অর্থ আমি কি পাঠাইনি, তোমার পূর্বে রসূলদের মধ্য থেকে এমন অনেক রসূলকে, যারা ছিল ওহি ব্যতিত? এখন যদি কেহ প্রশ্নবোধকটা উঠিয়ে দেয় তাহলে অর্থটা এর বিপরীত হবে। যেমন আমি পাঠাইনি তোমার পূর্বে রসূলদের মধ্য থেকে এমন রসূল যারা ছিল ওহি ব্যতিত। তাহলে কিন্তু আল্লার কথার বিপরীত অর্থ হবে। আর সেক্ষেত্রে আয়াতের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। আয়াতের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হলে তার জন্য কঠিন শাস্তি (সূরা হজ্ব-৫১)। কাজেই সূরা আম্বিয়ার ২৫ নং আয়াতটিকে প্রশ্নবোধক রেখেই অর্থ করতে হবে। সেক্ষেত্রে আয়াতের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে না। তাই আয়াতটির প্রকৃত অর্থ হবে 'আমি কি পাঠাইনি তোমার পূর্বে রসূলদের মধ্য থেকে এমন অনেক রসূলকে যারা ছিল ওহি ব্যতিত'। অর্থাৎ ওহি ব্যতিতও অনেক রসূল ছিল।
আরেকটি আয়াত যেমন সূরা হজ্বের ৫২ নং আয়াতে এসেছেÑওমা আরসালনা মিন কাবলিকা মিনার রাসুলি লা নাবি ইল্লা ইজা তামান্নাই। ...অর্থ আমি কি পাঠাইনি তোমার পূর্বে রসূলদের মধ্য থেকে এমন অনেক রসূল যারা নবী নহে। উক্ত দুই আয়াতে প্রশ্নবোধক শব্দ বাদ দিয়ে কোন অর্থ গ্রহণযোগ্য নহে। কারণ ওমা আরসালনা মিন কাবলিকা মিনার রাসুলি শব্দ দিয়ে রসূলদের মধ্যে দুই ধরণের রসূলের কথা বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ রসূলদের মধ্যে পার্থক্য আছে (সুরা বাকারা-২৫৩)।
পবিত্র কোরআনে এমন কোন আয়াত নেই যে, মা আরসালনা মিন কাবলিকা মিনান নাবীই। অর্থাৎ আমি কি পাঠাইনি তোমার পূর্বে নবীদের মধ্য থেকে এমন অনেক নবী? নবীদের মধ্য থেকে এমন অনেক নবী আছে, এমন কথা কোরআনে আসে নাই। কারণ নবীদের ভিতরে কোন পার্থক্য নাই (বাকারা-১৩৬)। সকল নবীই ওহি প্রাপ্ত বা কিতাব প্রাপ্ত। (ইমরান-৮১) (নেসা-১৬৩)। পক্ষান্তরে রসূলদের মধ্য থেকে এমন অনেক রসূল কথা কোরআনে আসছে। এতে প্রমাণ হয় রসূল দুই ধরনের। এক ধরনের রসূল ওহি প্রাপ্ত (মায়েদা-৬৭) আর অপর রসূল ওহি ব্যতীত (আম্বিয়া-২৫)। আর এই দুই ধরনের রসূলের মধ্য থেকে ওহি প্রাপ্ত রসুলের নাম কোরআনে এসেছে, আর ওহি ব্যতিত রসুলের নাম কোরআনে আসে নাই। (নেসা-১৬৪)। কাজেই উপরোক্ত আলোচনায় প্রমাণিত হয় যে, সূরা আম্বিয়ার ২৫ নং আয়াতটিকে কমন ওহির আয়াত হিসাবে অর্থ করা যাবে না কিংবা ওহি ব্যতিত কোন রসূল নেই এমন ভাবে অর্থ করা যাবে না। করলে সেটা অন্য আয়াতের সাথে পরস্পর বিরোধী হবে বিধায় উক্ত আয়াতের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। তাছাড়া যদি কেহ উক্ত আয়াতের অর্থ অন্যভাবে করে আয়াতের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করে তাদের জন্য কঠিন শাস্তি হল জাহান্নাম (সূরা হজ্ব ৫১)। কাজেই সূরা আম্বিয়ার ২৫নং আয়াতটিকে কমন ওহী নাযিলের দিকে অর্থ করা থেকে বিরত থাকাই উত্তম। কাজেই সূরা আম্বিয়ার ২৫নং আয়াতটির প্রকৃত উদ্দেশ্য ওহী ব্যতীত অনেক রসূল ছিল। আর সম্যকগুরুগণই হচ্ছে ওহী ব্যতীত রসূল।
অনেকে আছে যারা ওহীপ্রাপ্ত রসূলগণকে বিশ্বাস করে আর ওহী ব্যতীত রসূলগণকে অস্বীকার করে। এদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ বলেন উহারা কতক রসূলকে বিশ্বাস করে আর কতক রসূলকে অস্বীকার করেন। উহারা এই বিষয়ের মধ্যে একটা মধ্যবর্তী পথ অবলম্বন করতে চায় (সূরা নেসা ১৫০)। মূলত উহারাও কাফের বলে গণ্য হয় (সূরা নেসা ১৫১)। উপরোক্ত আলোচনায় প্রমাণিত হয় যে, রসূল হচ্ছে দুই প্রকার। একটা হচ্ছে ওহীপ্রাপ্ত রসূল আর অপরটি হচ্ছে ওহী ব্যতীত রসূল।
এইজন্য রসূলের মধ্যে পার্থক্য আছে (বাকারা- ২৫৩)। আর সেই পার্থক্যটা হচ্ছে এই যে, একটি হচ্ছে ওহীপ্রাপ্ত রসূল (মায়েদা-৬৭)
অপরটি হচ্ছে ওহী ব্যতিত রসূল (ইমরান-৮১) (সূরা আম্বিয়া-২৫)। যে রসূলটা নবীর কাছ থেকে রেসালতের মাধ্যমে আসছে। (ইমরান-৮১)। তিনি ওহী ব্যতীত রসূল। এখানে উল্লেখ্য যে, আল্লাহ যখন সরাসরি নবীর কাছে ওহী নাযিল করেন তখন তিনি শয়তান থেকে ওহীকে নিজে হেফাজত করে থাকেন (সূরা হিযর-১৭)। কিন্তু যে সকল রসূল, নবী নহেন, নবীর কাছ থেকে রিসালত প্রাপ্ত। সেই সকল রসূলগণ, সূরা আম্বিয়ার ২৫নং আয়াত অনুসারে পূর্বের নবী এবং রসূলগণের কিতাবের আয়াত প্রচার করতে গেলে তখন শয়তান তাদের অন্তরে কিছু প্রক্ষিপ্ত করে আল্লাহর আয়াতকে ব্যর্থ করার জন্য কিন্তু আল্লাহ নিজেই তখন তাদের অন্তর থেকে তাহা বিধুরিত করে দিয়ে আল্লাহর আয়াতকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, আমি কি পাঠাইনি তোমার পূর্বে এমন অনেক রসূল, যারা নবী নহে, উহারা যখন (পুর্বে নবীদের কিতাব থেকে আয়াত প্রচারের) আকাঙ্খা করিত, তখন শয়তান তাদের অন্তরে কিছু প্রক্ষিপ্ত করিত, তখন শয়তান তাদের অন্তরে যাহা প্রক্ষিপ্ত করিয়াছিল, আল্লাহ তাহা বিধুরিত করিয়া আল্লাহর আয়াতকে সু-প্রতিষ্ঠিত রাখে। আল্লাহ প্রজ্ঞাময় এবং সর্বজ্ঞ। (হজ্ব-৫২)।
এখানে উল্লেখ্য যে, যারা রসূল নহে এমনসব লোক যখন কোরআন প্রচার করতে যায়, তখনই তাদের অন্তরে শয়তান কিছু প্রক্ষিপ্ত করে মানুষের মধ্যে আল্লাহর আয়াত সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরী করে। তখনই কুরআনের এক আয়াতের অনুবাদ অন্য আয়াতের অনুবাদের সহিত পরিপন্থী হয়ে যায়। কিন্তু জেনে রাখবেন, কুরআনের মধ্যে পরস্পর বিরোধী কোন আয়াত নেই। এই জন্য কুরআন শিক্ষার জন্য আল্লাহ বলেন, রাসূল তোমাদিগকে কুরআন শিক্ষা দিবেন। (সূরা বাকারা-১৫১) (সূরা ইমরান-১৬৪)। এজন্য আল্লাহ বলেন, প্রত্যেক গ্রামে বা জনপদে আমার আয়াত আবৃত্তি করার জন্য রসূল পাঠাই (কাসাস-৫৯)। অনেকেই বলেন, প্রত্যেক রাসূলই কিতাবপ্রাপ্ত। যাহা উপরোক্ত আলোচনার পরিপন্থী কথা। এই মর্মে তারা পবিত্র কুরআনের সূরা আম্বিয়ার ২৫ নং আয়াতটি এই ভাবে অর্থ করে যে, তোমার পূর্বে যে সকল রাসূল পাঠিয়েছি তারা সকলেই ওহীপ্রাপ্ত। কিন্তু না, এই আয়াতে এ কথা বলা হয় নাই (বি: দ্র: পূর্বে এই আয়াতের শব্দ বিশ্লেষণ করা হয়েছে সেখানে বিস্তারিত কেধুন) প্রত্যেক রাসূল ওহী প্রাপ্ত নহে। প্রত্যেক রসূল ওহীপ্রাপ্ত, এই আয়াতে এটা বলা হয়নি, কারণ এমনটি বললে এই আয়াতটি অর্থাৎ (২১ : ২৫) আয়াতটি সূরা ইমরানের ৮১নং আয়াতের এবং সূরা হজ্বের ৫২নং আয়াতের সাথে পরস্পর বিরোধি বলে গণ্য হয়। কারণ প্রত্যেক রসূল ওহী প্রাপ্ত হলে প্রত্যেক রসূল কিতাব প্রাপ্ত হতো। কিন্তু আয়াতে বলেছে, প্রত্যেক নবী কিতাব প্রাপ্ত। (সুরা ইমরান ৮১) আর ওহী কিতাবের অংশ, ওহী ব্যতিত কোন কিতাব নেই। বিধায় এই আয়াত অনুসারে প্রত্যেক নবী ওহী প্রাপ্ত। যারা ওহী প্রাপ্ত তাদের কথা বলাই যদি সূরা আম্বিয়ার ২৫ নং আয়াতে উদ্দেশ্য হতো, তাহলে আয়াতটিতে বলা হতো, তোমার পূর্বে আমি ওহী ব্যতীত কোন নবী প্রেরণ করি নাই। কিংবা তোমার পূর্বে আমি যেসকল নবী পাঠিয়েছি তারা সকলে ওহী প্রাপ্ত। তাহলে সূরা ইমরানের ৮১নং আয়াতের সাথে সূরা আম্বিয়ার ২৫নং আয়াতটি পরস্পর বিরোধী হইত না। যেহেতু সূরা আম্বিয়ার ২৫ নং আয়াতে নবীর কথা আসে নাই। বরং রাসূল শব্দ এসেছে, তাহলে উক্ত আয়াতের উদ্দেশ্য হচ্ছে তোমার পূর্বে ওহী ব্যতীত অনেক রসূল ছিল এই কথা ব্যক্ত করেন। এখানে উল্লেখ যে, নবী মোহাম্মদ (স:) এর পূর্বে এবং ঈসা (আ:)-এর পরে অর্থাৎ ঈসা (আ:) এর পরে মোহাম্মদ (স:) এর পূর্বে মাঝখানে এই ৫০০ বৎসর এখানে কোন ওহী ছিল না। অথচ এখানে রসুল ছিল (সূরা মায়েদা-১৯)। আর সেই রসুলগণ ছিল ওহী ব্যতিত রসুল। আর এই ধরনের রসূলগণের নাম কিতাবে উল্লেখ আসে নাই (সুরা নেসা-১৬৪)। আর এই রসূলদের কথায় সূরা আম্বিয়ার ২৫নং আয়াতে বলা হয়েছে। নবীর কাজ ওহী প্রচার করা এমন আয়াত আসে নাই, বরং আয়াতে আসছে রসূলের কাজ হচ্ছে ওহী প্রচার করা। (মায়েদা-৯৯), (মায়েদা-৬৭)। তারপরও যদি কেহ মায়েদার ৬৭ আয়াত দিয়ে প্রমান করতে চায় যে, প্রত্যেক নবীর উপর যেমন ওহী নাযিল হয়েছে তেমনই প্রত্যেক রসূলের উপরও ওহী নাযিল হয়েছে। অর্থাৎ যদি তারা এমনটি বলে যে, প্রত্যেক নবীই ওহী প্রাপ্ত এবং প্রত্যেক রসূল ওহী প্রাপ্ত। অর্থাৎ নবী ও রসূল শব্দটি শুধু ওহীর সাথে সম্পৃক্ত। তাদের কথায় প্রমাণ হয় যে, নবী এবং রসূলের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। নবী ও রসূল একই ব্যক্তি এক পদ, যেটা ওহীর সাথে সর্ম্পক্যযুক্ত। তাদের কথা ঠিক নহে এই জন্য যে, নবী ও রসূল এক পদ নয়। প্রত্যেক নবীই কিতাবপ্রাপ্ত বা অহীপ্রাপ্ত (সূরা ইমরান-৮১)। কিন্তু প্রত্যেক রসুল কিতাবপ্রাপ্ত নহে বিধায় প্রত্যেক রসূল নবী নহে। এই মর্মে আল্লাহ বলেন তোমার পূর্বে আমি কি এমন অনেক রসুল পাঠাইনি যারা নবী নহে (সূরা হজ্জ্ব-৫২)? অর্থাৎ যাহাদের উপর অহী নাযিল হয়নি তাহারা নবী নহে বিধায় প্রত্যেক রসুল অহীপ্রাপ্ত নহে এটা নিশ্চিত। আবার নবী ও রসূলের মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য আছে। কারণ নবী ও রসূল একই ব্যক্তি নাও হতে পারে। এটাই বড় পার্থক্য। মর্যাদাগত বা গুণগত পার্থক্যের বিষয়টি এই পুস্তকের 'নবী ও রসূল এর মধ্যে পার্থক্য' অধ্যায়ে বিস্তারিত দেখুন। এখানে আমি একটা বিষয়ে বলতে চাই, নবী ও রসূল যখন আলাদা ব্যক্তি তখন নবী ও রসূল এর ভিতরে পার্থক্য আছে প্রমাণিত হয়। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, হে নবী তোমার কাছে যখন একজন রসূল আসবে (ইমরান-৮১) এই আয়াতে অবশ্যই প্রমাণিত হয় যে, নবীর কাছে যে রসূল আসবেন তিনি নিশ্চয়ই নবী নহে, তিনি শুধু রসূল। আবার আল্লাহ বলেন, তোমরা রসূলের আনুগত্য করলে নবীর সঙ্গী হবে (নেসা-৬৯)। এই আয়াতের উল্লেখিত রসূল নিশ্চয়ই নবী নহে, ভিন্ন ব্যক্তি। আবার সুরা হজ্বের ৫২ নং আয়াতে বলা হয়েছে অনেক রসূল আছে যারা নবী নহে। অতএব, নবী এবং রসূলের মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য আছে, আর সেই পার্থক্যটাই হচ্ছে প্রত্যেক নবীর উপরেই কিতাব বা ওহী নাযিল হয়েছে (ইমরান-৮১), (নেসা-১৬৩) এবং প্রত্যেক নবীকেই নবুয়ত দেওয়া হয়েছে। (ইমরান-৭৯)। প্রত্যেক নবীর উপর নবুয়ত, ওহী, কিতাব নাযিল হওয়ার পরে তাকে রেসালত দেওয়া হয়েছে। (জ্বীন-২৩) এজন্য প্রত্যেক নবীই রসূল। কিন্তু প্রত্যেক রসূলই নবী নহে। (হজ্ব-৫২)। নবী এক সময় শেষ হবে (আহযাব-৪০)। কিন্তু ইবলিশকে প্রতিহত করার জন্য রসূল (সূরা নাহল-৩৬) কাজেই ইবলিশ যত দিন জীবিত থাকবে ততোদিন রসূল থাকবে এটা নিশ্চিত। এইজন্য রসূল বিরতিহীন একের পর এক আসবে (মমিন-৪৪)। কাজেই সম্যক গুরুগণই রসূল। তারা কোন বিনিময় গ্রহণ করে না। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, যারা কোন বিনিময় গ্রহণ করে না, এবং সঠিক পথে আছে, তুমি তাদের অনুসরণ কর (ইয়াসিন-২১)। বিধায় সম্যক গুরু তথা রসুলগণকেই অনুসরণ ও আনুগত্য করতে হবে। মনে রাখবেন এটাই হচ্ছে পবিত্র কোরআনের বুঝ। আল্লাহ বলেন কোরানের বুঝ যারা অপছন্দ করেন তাদের কর্মফল বিনষ্ট হবে (সূরা মোহাম্মদ-৯)।
সম্যক গুরু তথা রসূলের সঙ্গ ধারণ যারা না করল, তারাই সেদিন ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং নিজের হস্ত দংশন করে আফশোস করে বলবে, হায়! আমি যদি রসূলের সঙ্গ ধারণ করতাম এবং ঐ সৎ পথটা গ্রহণ করতাম (ফুরকান, ২৭ আয়াত)। এই জন্য আল্লাহ বলেন সেই দিবস আসার পূর্বেই আল্লাহর আহ্বানে সারা দাও (সূরা শুরা-৪৭)। সম্যক গুরু তথা রসূলের সঙ্গ ধারণ করে তার আনুগত্য করার মাধ্যমই হচ্ছে ইহকাল ও পরকালের মানব মুক্তির একমাত্র পথ।


পবিত্র কোরআন থেকে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা